Article

Islamic Articles

Subject Category : তাগুত

ইসলামী শরী‘য়াহর বাস্তবায়ন ও উম্মাহর উপর এর প্রভাব

Print Make Small Font Make Big font

ooo

 


ইসলামী শরী‘য়াহর বাস্তবায়ন ও উম্মাহর উপর এর প্রভাব


[ বাংলা – Bengali – بنغالي ]


 


আব্দুল্লাহ ইবন স‘উদ আল-হুয়াইমিল


 


 


অনুবাদ : আব্দুল্লাহ আল মামুন


 


সম্পাদনা : ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী


 


 


 


 


 


2014 - 1435


 


 


 


﴿ تطبيق الشريعة وأثرها على الأمم ﴾


« باللغة البنغالية »


 


 


 


 


عبد الله بن سعود الهويمل


 


 


 


ترجمة: عبد الله المأمون


مراجعة: د/ محمد منظور إلهي


 


 


 


 


 


2014 - 1435


 


 


 


ভূমিকা


সব প্রশংসা সে মহান আল্লাহর যিনি ইসলামকে আমাদের জন্য জীবন বিধান ও পন্থা হিসেবে নির্বাচন করেছেন। আমরা তাঁর প্রশংসা করছি, তারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি, তাঁর নিকট ক্ষমা চাচ্ছি, তাঁর কাছে আমাদের অন্তরের সব কলুষ ও পাপ থেকে পানাহ চাই। তিনি যাকে হিদায়াত দান করেন কেউ তাকে গোমরাহ করতে পারে না, আর তিনি যাকে পথ-ভ্রষ্ট করেন কেউ তাকে হিদায়াত দিতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো হক্ব ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরীক নেই, আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।


অতঃপর, বর্তমান মুসলিম উম্মাহর দিকে তাকালে ও তাদের বাস্তব অবস্থা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করলে দেখা যাবে তাদের অনেকেই পথভ্রষ্ট হয়েছে, বর্তমানে তারা আসমানি শরী‘য়াহ পরিহার করেছে ও আল্লাহ প্রদত্ত বিধান ছেড়ে মানব রচিত বিধানের পথে চলছে। তারা পরস্পর বিরোধী এমন কিছু মানব রচিত জীবন বিধান ও আইন কানুনে নিজেদের জীবনকে পরিচালিত করছে, যা শুধু বুদ্ধি-বিবেক প্রসূত চিন্তা ভাবনা ছাড়া আর কিছুই নয়।


ইসলামী রাষ্ট্রে শাসকদের ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা এক অসহনীয়  পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তাদের কেউ কেউ পূর্ব-পশ্চিমে তাদের আধিপত্য বিস্তার করতে ইসলামের সাধ্য ও প্রচেষ্টাকে অস্বীকার করে বসল। কেউ আবার অমুসলিমদের থেকে নানা বুদ্ধি ও আইন কানুন আমদানি করতে লাগল। তারা এ সব আইন কানুন রাষ্ট্রে অত্যাবশ্যকীয় করল এবং যারা এ সবের বিরোধিতা করত বা এ সব দিয়ে হুকুমত পরিচালনা করতে অস্বীকার করত তাদেরকে ভর্ৎসনা করা হত। এ কারণেই আমি এ সংক্ষিপ্ত আলোচনাটি নিজ দায়িত্ব আদায়ের জন্য লিপিবদ্ধ করেছি। এতে ইসলামী শরী‘য়াহ বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছি ও মানব রচিত আইন কানুনকে প্রত্যাখ্যান করার যথার্থতা বর্ণনা করেছি; কেননা মানুষের তৈরী আইনই মুসলমানদের দুর্দশা ও দুশ্চিন্তার হেতু।


আমি এ গবেষণাপত্রটি সাতটি পরিচ্ছেদে ভাগ করেছি, সেগুলো হলো:


প্রথম পরিচ্ছেদ: ইসলামী শরী‘য়াহর পরিচয়।


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: ইসলামী শরী‘য়াহর উৎসসমূহ।


তৃতীয় পরিচ্ছেদ: ইসলামী শরী‘য়াহর বৈশিষ্ট্যসমূহ।


চতুর্থ পরিচ্ছেদ: ইসলামী শরী‘য়াহ সহজ সরল হওয়ার দলিল।


পঞ্চম পরিচ্ছেদ: ইসলামী শরী‘য়াহ বাস্তবায়নের হুকুম।


ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: আল্লাহর নাযিল কৃত বিধান ছাড়া অন্য বিধান অনুযায়ী শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করার কারণসমূহ।


সপ্তম পরিচ্ছেদ: ইসলামী শরী‘য়াহর ব্যাপারে কতিপয় দ্বিধা সংশয় এবং এগুলোর অপনোদন।


উপসংহার।


 


 


 


প্রথম পরিচ্ছেদ


ইসলামী শরী‘য়াহর পরিচয়


শরী‘য়াহর শাব্দিক অর্থ: ‘শরী‘য়াহ্’ একটি আরবী শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ দ্বীন, জীবন-পদ্ধতি, ধর্ম, জীবন আচার, নিয়ম-নীতি ইত্যাদি। তবে আরবী ভাষায় শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হল - পানির উৎসস্থল বা যে স্থান থেকে পানি উৎসারিত হয়ে গড়িয়ে পড়ে এবং মানুষ সেখানে এসে পানি পান করে পিপাসা নিবারণ করে।


শরী‘য়াহ্ হলো যা বান্দাহর জীবন পরিচালনার  জন্য আল্লাহ তা‘আলা বিধিবদ্ধ করেছেন। যেমন বলা হয়: الشارع যার অর্থ হল


الطريق الأعظم (বড় রাস্তা), আবার যখন ঘরের দরজা রাস্তার দিক দিয়ে খোলা থাকে তখন বলা হয়- شرَّعَ المنزلَ অর্থাৎ বড় রাস্তামুখী করে সে ঘর তৈরী করেছে। আরো বলা হয় -شرعت في هذا الأمر شروعًا  অর্থাৎ এ বিষয়ে আমি অনুসন্ধান শুরু করেছি। পশু যখন পানি পান করতে ঘটে নামে বলা হয়, وشَرَعَتِ الدوابُّ في الماء, وتشرع شرعًا: إذا دخلت. অর্থাৎ পশু পানিতে প্রবেশ করেছে।


শরী‘য়াহ্ হলো জীবন বিধান। কুরআনে এসেছে:


﴿ لِكُلّٖ جَعَلۡنَا مِنكُمۡ شِرۡعَةٗ وَمِنۡهَاجٗاۚ ﴾ [المائ‍دة: ٤٨]


‘‘তোমাদের প্রত্যেকের জন্য শরী‘য়াহ ও জীবন-পদ্ধতি নির্ধারণ করেছি।’’ [সূরা আল-মায়িদাহ : ৪৮]


শরী‘য়াহর পারিভাষিক অর্থ:


والشريعة الإسلامية في الاصطلاح: ما شرعه الله لعباده من العقائد والعبادات والأخلاق والمعاملات ونظم الحياة في شعبها المختلفة لتحقيق سعادتهم في الدنيا والآخرة.


‘‘মহান আল্লাহ তা‘আলা বান্দার জীবন ও জগত পরিচালনার জন্য যে আক্বিদা, ইবাদত, আখলাক, লেনদেন ও জীবন ব্যবস্থা প্রদান করেছেন, যা তাদের ইহকালীন ও পরকালীন শান্তি বাস্তবায়ন করে তা-ই হল ইসলামী শরীয়াহ্’’।


 


 


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ


ইসলামী শরী‘য়াহর মূল উৎসসমূহ


 


প্রথম উৎস: আল-কুরআনুল কারীম:


ইসলামী শরী‘য়াহ এর সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ উৎস হচ্ছে আল-কুরআনুল কারীম। এটি قرأ ক্রিয়ার মাসদার। এর শাব্দিক অর্থ: জমা করা, একত্র করা। অতঃএব, القراءة অর্থ: উচ্চারণে এক হরফকে আরেক হরফের সাথে মিলানো। আল-কুরআনকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর অবতীর্ণ কিতাব নামে খাস করা হয়েছে। ফলে কুরআনকে কিতাব বলা হয়। কতিপয় উলামা বলেছেন, আল্লাহর কিতাবসমূহের মধ্যে এ কিতাবকে কুরআন বলার কারণ হলো এটা অন্যান্য সব কিতাবের সারাংশ, বরং সব ইলমের সারমর্ম এতে একত্রিত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা এ ব্যাপারে বলেছেন:


﴿ لَقَدۡ كَانَ فِي قَصَصِهِمۡ عِبۡرَةٞ لِّأُوْلِي ٱلۡأَلۡبَٰبِۗ مَا كَانَ حَدِيثٗا يُفۡتَرَىٰ وَلَٰكِن تَصۡدِيقَ ٱلَّذِي بَيۡنَ يَدَيۡهِ وَتَفۡصِيلَ كُلِّ شَيۡءٖ وَهُدٗى وَرَحۡمَةٗ لِّقَوۡمٖ يُؤۡمِنُونَ ١١١ ﴾ [يوسف: ١١١]


“তাদের এ কাহিনীগুলোতে অবশ্যই বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে শিক্ষা, এটা কোনো বানানো গল্প নয়, বরং তাদের পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যায়নকারী এবং প্রতিটি বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ। আর হিদায়াত ও রহমত ঐ কওমের জন্য যারা ঈমান আনে।” [সূরা ইউসুফ: ১১১]


আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন,


﴿ وَيَوۡمَ نَبۡعَثُ فِي كُلِّ أُمَّةٖ شَهِيدًا عَلَيۡهِم مِّنۡ أَنفُسِهِمۡۖ وَجِئۡنَا بِكَ شَهِيدًا عَلَىٰ هَٰٓؤُلَآءِۚ وَنَزَّلۡنَا عَلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ تِبۡيَٰنٗا لِّكُلِّ شَيۡءٖ وَهُدٗى وَرَحۡمَةٗ وَبُشۡرَىٰ لِلۡمُسۡلِمِينَ ٨٩ ﴾ [النحل: ٨٩]


“আর স্মরণ কর, যেদিন আমি প্রত্যেক উম্মতের কাছে, তাদের থেকেই তাদের বিরুদ্ধে একজন সাক্ষী উত্থিত করব এবং তোমাকে তাদের উপর সাক্ষীরূপে হাযির করব। আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনা, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সংবাদস্বরূপ”। [সূরা আন-নাহল: ৮৯]


উলামাগণ আল-কুরআনের সংজ্ঞায় বলেছেন:


القرآن هو كلام الله الذي أنزل على محمد ، ونقل إلينا تواترًا لنتعبد بتلاوته وأحكامه، وليكون آية دالة على صدق رسول الله  في رسالته، وقد نزل به جبريل على رسول الله  بلسان عربي.


আল- কুরআন হলো আল্লাহর কালাম যা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর নাযিল হয়েছে এবং আমাদের কাছে মুতাওয়াতির তথা অসংখ্য ধারাবাহিক বর্ণনার মাধ্যমে পৌঁছেছে, যাতে আমরা এর তিলাওয়াত ও আহকাম পরিপালনের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করি, আর যাতে এটি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের সত্যতার দলিল হয়ে যায়। জিবরীল আলাইহিস সালাম এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আরবি ভাষায় নাযিল করেছেন।


আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,


﴿ وَإِنَّهُۥ لَتَنزِيلُ رَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ١٩٢ نَزَلَ بِهِ ٱلرُّوحُ ٱلۡأَمِينُ ١٩٣ عَلَىٰ قَلۡبِكَ لِتَكُونَ مِنَ ٱلۡمُنذِرِينَ ١٩٤ بِلِسَانٍ عَرَبِيّٖ مُّبِينٖ ١٩٥ ﴾ [الشعراء: ١٩٢،  ١٩٥]


“আর নিশ্চয় এ কুরআন সৃষ্টিকুলের রবেরই নাযিলকৃত। বিশ্বস্ত আত্মা এটা নিয়ে অবতরণ করেছে। তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হও। সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়।” [সূরা আশ-শু‘আরা: ১৯২-১৯৫]


ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরবের লোকদেরকে কুরআনের অনুরূপ কিছু নিয়ে আসতে চ্যালেঞ্জ করলেন। তখনকার সময়ে তারা  সাহিত্যের বাগ্মিতা ও বয়ানে ছিল সেরা। কিন্তু তারা অক্ষম হলো। এভাবেই কুরআন তাদের বিপক্ষে দলিল হিসেবে দাঁড়ালো।


আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,


﴿ وَإِن كُنتُمۡ فِي رَيۡبٖ مِّمَّا نَزَّلۡنَا عَلَىٰ عَبۡدِنَا فَأۡتُواْ بِسُورَةٖ مِّن مِّثۡلِهِۦ وَٱدۡعُواْ شُهَدَآءَكُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ إِن كُنتُمۡ صَٰدِقِينَ ٢٣ ﴾ [البقرة: ٢٣]


“আর আমি আমার বান্দার উপর যা নাযিল করেছি, যদি তোমরা সে সম্পর্কে সন্দেহে থাক, তবে তোমরা তার মত একটি সূরা নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সাক্ষীসমূহকে ডাক; যদি তোমরা সত্যবাদী হও”। [সূরা আল-বাকারা: ২৩]


আল-কুরআন হলো দ্বীনের মূলভিত্তি, ইসলামি শরী‘য়াহর মূল উৎস,  সর্বযুগে ও সর্বদেশে এটি আল্লাহর সুস্পষ্ট দলিল।


সাহাবাগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের থেকে তিলাওয়াত, হিফয, অর্থ পড়া ও এ অনুযায়ী আমল করা ইত্যাদি সরাসরি গ্রহণ করেছেন।


قال أبو عبد الرحمن السّلمي: حدثنا الذين كانوا يقرِّؤننا القرآن: عثمان بن عفان، وعبد الله بن مسعود، وغيرهما، أنهم كانوا إذا تعلموا من النبي  آيات لا يتجاوزونها حتى يتعلموها وما فيها من العلم والعمل، قال: «فتعلمنا القرآن والعلم والعمل جميعًا».


“আবু আব্দুর রহমান আস-সুলামী (রহ.) বলেছেন, আমাদের কাছে সে সব সাহাবাগণ বর্ণনা করেছেন যারা আমাদেরকে কুরআন শিখিয়েছেন, যেমন উসমান ইবন আফফান, আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ প্রভৃতি। তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে দশটি আয়াত শিখলে যতক্ষণ না এর সব ইলম ও আমল শেষ না হতো ততক্ষণ সামনে এগুতেন না। তারা বলেছেন: এভাবে আমরা ইলম ও আমল উভয় সহকারে কুরআন শিখেছি।”


যুগে যুগে মুসলমানগণ কুরআন হিফয করে আসছে। মুসলিম উম্মাহ কালের পরিক্রমায় বংশানুক্রমে কোনো ধরনের পরিবর্তন বা পরিবর্ধন ছাড়াই কুরআন লিখিতভাবে বর্ণনা করে আসছে। এটা আল্লাহ তা‘আলার এ বাণীরই প্রতিফলন:


﴿ إِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا ٱلذِّكۡرَ وَإِنَّا لَهُۥ لَحَٰفِظُونَ ٩ ﴾ [الحجر: ٩]


“আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক”। [সূরা হিজর, আয়াত ৯]


 


দ্বিতীয়ত: সুন্নাহ ও শরীয়াহ আইনে এর অবস্থান:


সুন্নাহ এর শাব্দিক অর্থ পথ, পদ্ধতি ও জীবন চরিত; চাই তা প্রশংসনীয় হোক বা নিন্দনীয়। এ শব্দটির ব্যবহার আল-কুরআনে ও হাদীসে এ অর্থে এসেছে। যেমন: আল-কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,


﴿ سُنَّةَ مَن قَدۡ أَرۡسَلۡنَا قَبۡلَكَ مِن رُّسُلِنَاۖ وَلَا تَجِدُ لِسُنَّتِنَا تَحۡوِيلًا ٧٧ ﴾ [الاسراء: ٧٧]


“তাদের নিয়ম অনুসারে যাদেরকে আমি আমার রাসূলদের মধ্যে তোমার পূর্বে পাঠিয়েছিলাম এবং তুমি আমার নিয়মে কোনো পরিবর্তন পাবে না”। [সূরা আল-ইসরা: ৭৭]


﴿ سُنَّةَ ٱللَّهِ ٱلَّتِي قَدۡ خَلَتۡ مِن قَبۡلُۖ وَلَن تَجِدَ لِسُنَّةِ ٱللَّهِ تَبۡدِيلٗا ٢٣ ﴾ [الفتح: ٢٣]


“তোমাদের পূর্বে যারা গত হয়েছে তাদের ব্যাপারে এটি আল্লাহর নিয়ম; আর তুমি আল্লাহর নিয়মে কোনো পরিবর্তন পাবে না”। [সূরা আল-ফাতহ: ২৩]


হাদীসে এ শব্দটির ব্যবহার এভাবে এসেছে:


عَنْ أَبِي سَعِيدٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: «لَتَتَّبِعُنَّ سَنَنَ مَنْ قَبْلَكُمْ شِبْرًا بِشِبْرٍ، وَذِرَاعًا بِذِرَاعٍ، حَتَّى لَوْ سَلَكُوا جُحْرَ ضَبٍّ لَسَلَكْتُمُوهُ»، قُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ: اليَهُودَ، وَالنَّصَارَى قَالَ: «فَمَنْ»


“আবু সাঈদ খুদুরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয় তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের আচার-আচরণকে পুরোপুরি অনুকরণ করবে, প্রতি বিঘতে বিঘতে, প্রতি হাতে হাতে। এমনকি তারা যদি গুঁইসাপের গর্তেও প্রবেশ করে থাকে, তাহলে তোমরাও এতে তাদের অনুকরণ করবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এরা কি ইহুদি ও নাসারা? তিনি বললেন: আর কারা?”


قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً حَسَنَةً، فَلَهُ أَجْرُهَا، وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا بَعْدَهُ، مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْءٌ، وَمَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً سَيِّئَةً، كَانَ عَلَيْهِ وِزْرُهَا وَوِزْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا مِنْ بَعْدِهِ، مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أَوْزَارِهِمْ شَيْءٌ»


“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে কোনো উত্তম প্রথা বা কাজের প্রচলন করে সে তার এ কাজের সাওয়াব পাবে এবং তার পরে যারা তার এ কাজ দেখে তা করবে সে এর বিনিময়েও সাওয়াব পাবে। তবে এতে তাদের সাওয়াব থেকে কোনো অংশ কমানো হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে (ইসলামের পরিপন্থি) কোনো খারাপ প্রথা বা কাজের প্রচলন করবে, তাকে তার এ কাজের বোঝা (গুনাহ এবং শাস্তি) বহন করতে হবে। তারপর যারা তাকে অনুসরণ করে এ কাজ করবে তাদের সমপরিমাণ বোঝাও তাকে বইতে হবে। তবে তাদের অপরাধ ও শাস্তির কোনো অংশই কমানো হবেনা।”


 


 


ফিকাহবিদদের মতে সুন্নাহ হলো:


السنة عند الفقهاء: ما ثبت عن النبي  من غير وجوب؛ فهي أحد الأحكام التكليفية الخمسة.


যে সব বিধান নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ওয়াজিব হওয়া ছাড়াই সাব্যস্ত হয়েছে। এটি শরী‘য়াহর পাঁচ প্রকার বিধানের একটি। সেগুলো হলো: ফরয, হারাম, সুন্নাত, মাকরূহ ও মুস্তাহাব।


উসূলবিদদের মতে সুন্নাহ হলো:


السنة عند الأصوليين: ما صدر عن النبي  غير القرآن الكريم من قول، أو فعل أو تقرير.


কুরআন ব্যতীত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা, কাজ ও মৌন সমর্থনকে সুন্নাহ বলে।


মুহাদ্দিসীনদের মতে সুন্নাহ হলো:


السنة عند المحدثين: ما أثر عن النبي  من قول، أو فعل، أو تقرير، أو صفة، أو سيرة.


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা, কাজ, মৌন সমর্থন, তাঁর সাধারণ গুণাবলী বা তাঁর জীবন চরিতকে হাদীস বলে।


মুসলমানগণ এ ব্যাপারে একমত যে, শরী‘য়াহর বিধান বা রাষ্ট্র পরিচালনা ও বিচার কার্যে যা কিছু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রকাশ পেয়েছে, চাই তা তাঁর কথা বা কাজ বা মৌন সমর্থন যাই হোক এবং তা আমাদের পর্যন্ত সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো মুসলমানদের জন্য দলিল ও শরী‘য়াহর মূলভিত্তি হিসেবে ধর্তব্য হবে। মুজতাহিদগণ এ থেকে শর‘ঈ বিধি-বিধান ও বান্দাহর আদেশ নিষেধ উদ্ভাবন করবেন।


তৃতীয়ত: আল-ইজমা’ :


الإجماع: هو اتفاق جملة أهل الحل والعقد من أمة محمد  في عصر من الأعصار، على حكم واقعة من الوقائع».


ইজমা’ হচ্ছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর পর মুসলিম উম্মাহর মুজতাহিদগণ কোনো এক যুগে শরী‘য়াহ এর কোনো এক বিধানের উপর একমত হওয়া।


মুসলমানগণ একমত যে, ইজমা‘ শরী‘য়াহ এর দলিল, প্রত্যেক মুসলিমের উপর এ অনুযায়ী আমল করা ওয়াজিব। কুরআন ও সুন্নাহ থেকে ইজমা দলিল হওয়ার প্রমাণ:


আল-কুরআনে এসেছে:


﴿ وَمَن يُشَاقِقِ ٱلرَّسُولَ مِنۢ بَعۡدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ ٱلۡهُدَىٰ وَيَتَّبِعۡ غَيۡرَ سَبِيلِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ نُوَلِّهِۦ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصۡلِهِۦ جَهَنَّمَۖ وَسَآءَتۡ مَصِيرًا ١١٥ ﴾ [النساء: ١١٥]


‘‘কারো নিকট হেদায়াত প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যেদিকে সে ফিরে যায় সেদিকেই তাকে ফিরিয়ে দেব এবং জাহান্নামে তাকে দগ্ধ করব।’’ [সূরা আন-নিসা : ১১৫]


روي عن النبي  قال: «أمتي لا تجتمع على الخطأ، سألت الله ألا يجمع أمتي على الضلالة فأعطانيه، ومن سره بحبوحة الجنة فليتزم الجماعة، ومن فارق الجماعة قيد شبرٍ فقد خلع ربقة الإسلام من عقه».


নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘আমার উম্মত ভুলের উপর একমত হবে না। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি তিনি যেন আমার উম্মতকে ভ্রষ্টতার উপর কখনো একমত না করেন। ফলে আল্লাহ আমার দো‘য়া কবুল করেছেন। তাই যে জান্নাতের স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করতে  চায় সে যেন জামা‘আতের সাথে থাকে। আর যে ব্যক্তি জামা‘আত থেকে সামান্য পরিমাণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, সে তার ঘাড় থেকে ইসলামের রশিকে ছিন্ন করল (অর্থাৎ ইসলাম থেকে দূরে সরে গেল)”।


চতুর্থ: আল-ক্বিয়াস:


القياس في اصطلاح الأصوليين: هو تسوية واقعة لم يرد نص بحكمها بواقعة ورد نص بحكمها في الحكم الذي ورد به النص لتساوي الواقعتين فل علة هذا الحكم.


কিয়াস হচ্ছে কোনো বিষয়ের জন্য সে বিধান নির্ধারণ করা, যে বিধান স্পষ্টভাবে অন্য একটি বিষয়ের জন্য কুরআন বা হাদীসে বর্ণনা করা আছে, উভয় বিষয়ের মধ্যে সামঞ্জস্যবিধানকারী ‘ইল্লাত’ বা হেতু থাকার কারণে।


অধিকাংশ ফিকহবিদগণ একমত যে, কিয়াস শরীয়তের দলিল, এর দ্বারা আহকাম সাব্যস্ত করা হয়।


জমহুর উলামা কিরাম কিয়াস শরীয়তের দলিল হওয়ার অনেক হাদীস উল্লেখ করেছেন, তন্মধ্যে কয়েকটি হলো:


নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে সাওম অবস্থায় স্ত্রীকে চুম্বন করা সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত উত্তরে বলেছিলেন:


" أَرَأَيْتَ لَوْ تَمَضْمَضْتَ بِمَاءٍ وَأَنْتَ صَائِمٌ؟


“যদি তুমি সাওম অবস্থায় কুলি করো তাতে কি সাওম ভঙ্গ হবে? (অর্থাৎ সাওম অবস্থায় পানি দিয়ে কুলি করলে যেমন সাওম ভাঙ্গে না, তেমনি স্ত্রীকে চুম্বন করলেও সাওম ভাঙ্গে না)। এটা ছিল রাসূলের পক্ষ থেকে উম্মতকে কিয়াস শিক্ষা দেয়া। কেননা এখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম চুম্বনকে কুলির সাথে কিয়াস করেছেন। উভয়টিতেই সাওম ভঙ্গ হয় না।


সাহাবা কিরামগণ শরীয়তের কিছু বিধান ইজতিহাদ করে বের করেছেন, অথচ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মাঝে ছিলেন। তিনি তাদেরকে তিরস্কার করেননি। এটা ঘটেছিল যখন তিনি তাদেরকে আহযাবের যুদ্ধের দিন আসরের সালাত বনী কুরাইযাতে গিয়ে আদায় করতে নির্দেশ দেন। পথিমধ্যে আসরের ওয়াক্ত হলে তাদের কিছু সংখ্যক ইজতিহাদ করে পথেই সালাত আদায় করেন। তারা বললেন, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের থেকে সালাত বিলম্বে আদায় করা চাননি, বরং তিনি চেয়েছেন আমরা যেন দ্রুত বনী কুরাইযাতে যাই”। ফলে তারা রাসূলের আদেশের অর্থের দিকে লক্ষ্য করেছেন। অন্য দল শব্দের দিকে তাকিয়ে ইজতিহাদ করে আসরের সালাত বনী কুরাইযাতে গিয়ে বিলম্বে আদায় করেন।


যেসব ব্যাপারে স্পষ্ট নস পাওয়া যায় না সে ক্ষেত্রে কিয়াস হলো উক্ত মাস’আলার হুকুম উদঘাটনে প্রথম পদ্ধতি বা উপায়। এটা ইসতিম্বাতের ক্ষেত্রে খুবই স্পষ্ট ও শক্তিশালী পন্থা।


কিয়াস চারটি আরকানের উপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে:


১- আসল বা মূল মাস’আলা, যার হুকুমের ব্যাপারে নস এসেছে।


২- ফর‘আ তথা শাখা মাস’আলা, যার হুকুম মূল মাস’আলার উপর কিয়াস করে দেয়া হবে।


৩- আল-ইল্লাহ তথা কারণ, যে কারণের উপর ভিত্তি করে মূল মাস’আলার হুকুম এসেছে এবং এটা শাখা মাস’আলার মাঝেও পাওয়া যাবে।


৪- মূল মাস’আলার হুকুম। অতঃপর যদি উপরিউক্ত সব শর্ত সঠিকভাবে সর্বসম্মতভাবে পাওয়া যায় তবে তা সহীহ কিয়াস হবে, নতুবা কিয়াসটি ফাসিদ বলে গণ্য হবে।


পঞ্চমত: আল-ইসতিহসান:


الاستحسان في اصطلاح الأصوليين القائلين به: هو العدول عن حكم اقتضاه دليل شرعي في واقعة إلى حكم آخر فيها؛ لدليل شرعي اقتضى هذا العدول... وهذا الدليل الشرعي المقتضي للعدول هو سند الاستحسان.


উসূলবিদদের মতে আল-ইসতিহসান হল, কোনো ঘটনায় একটি দলিলে শর‘য়ীর চাহিদা মোতাবেক যে হুকুম হয় তা না দিয়ে অন্য দলিলের চাহিদা মোতাবেক অন্য হুকুম দেয়া। এ শর‘য়ী দলীলটি - যা উক্ত মাস’আলার হুকুম থেকে বিরত রেখে অন্য হুকুম দিয়েছে - ইসতিহসানের সনদ তথা ভিত্তি।


অন্য কথায়, ইসতিহসান হল একটি দলিলকে অন্যের উপর অগ্রাধিকার দেয়া, যা অগ্রাধিকার প্রদানকারী দলিলের বিপরীত হুকুম দেয়। কখনো কখনো এ প্রধান্যটা কিয়াসে যাহির তথা স্পষ্ট কিয়াস থেকে কিয়াসে খফী তথা অস্পষ্ট কিয়াসের দাবীর দিকে প্রত্যাবর্তনের কারণে হয়ে থাকে, বা ‘আম নসের উপর খাস নসের হুকুমের চাহিদার কারণে বা কুল্লী তথা সমষ্টিক হুকুমের উপর হুকমে ইসতিসনায়ী তথা কিছু সংখ্যকের উপর হুকুম দেয়ার দিকে প্রত্যাবর্তনের কারণে হয়ে থাকে।


وقال الإمام مالك: «هو القول بأقوى الدليلين».


ইমাম মালিক রহ. বলেছনে, দু’টি দলিলের মধ্যে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী দলিলের উপর আমল করাকে ইসতিহসান বলে।


ইমাম আবু হানিফা রহ. বলেছেন, কিয়াসে খফীকে কিয়াসে জলী থেকে বা কুল্লী মাস’আলা থেকে জুঝয়ী মাস’আলাকে প্রধান্য দেয়া।


 


 


 


তৃতীয় পরিচ্ছেদ


ইসলামী শরী‘য়াহর বৈশিষ্ট্যাবলী


প্রথমত: এটি আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধান:


ইসলামী শরী‘য়াহর মূল বৈশিষ্ট্য হলো এটি আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধান যা মহান আল্লাহর তরফ থেকে নাযিল কৃত। এতে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর তরফ থেকে। চাই সংক্ষিপ্ত নস হোক বা বিস্তারিত বিবরণ, সরাসরি নসের থেকে মাস’আলা উদ্ভাবন হোক বা নসের উপর কিয়াস করে মাস’আলা উদ্ভাবন। ইজতিহাদ ও কিয়াসের পদ্ধতিসমূহ কুরআন ও সুন্নাহর নসের উপর ভিত্তি করেই হয়ে থাকে, এমনিভাবে ফুকাহায়ে কিরামদের মতামতও কুরআন সুন্নাহ এর উপর ভিত্তি করেই করে থাকেন।


দ্বিতীয়ত: এটি ব্যক্তি ও সমাজের কল্যাণ ও স্বার্থ বাস্তবায়ন করে:


ইসলামী শরী‘য়াহ ব্যক্তি ও সমাজের কল্যাণ ও স্বার্থ বাস্তবায়ন করে। কেননা ইসলামী শরী‘য়াহ যেহেতু মহান আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে নাযিল কৃত, যিনি সব কিছুই জ্ঞাত, তিনি সর্বকালে ও স্থানে ব্যক্তির অন্তরের গোপনীয়তা ও সৃষ্টির স্বভাব চরিত্র সম্পর্কে সর্বজ্ঞ। তিনি তাদের অতীত ও বর্তমান সব কিছুই জানেন। সেহেতু এটি মানব জাতির শান্তি বাস্তবায়ন করে যখন তারা এ অনুযায়ী জীবন যাপন করবে। কেননা এটা মানব জীবন পরিচালনার সব নিয়ম কানুন অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাদের শান্তি ও কল্যাণ বাস্তবায়ন করে, এমনকি তাদের জন্মের পূর্বেও তাদের কল্যাণের প্রতি খেয়াল রাখে। যেমন, পিতাকে বিয়ের আগে উত্তম মা নির্বাচন করতে নির্দেশ দিয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,


قال : «حق الولد على والده أن يحسن موضعه وأن يحسن اسمه وأدبه».


“পিতার উপর সন্তানের অধিকার হলো তিনি তার জন্মের উত্তম স্থান (উত্তম মা) নির্ধারণ করবেন এবং জন্মের পরে তার ভাল নাম রাখবে ও আদব শিক্ষা দিবে”।


অন্যদিকে ইসলামী শরী‘য়াহ সন্তানের উপর পিতার আনুগত্য ও তাদের প্রতি ইহসানের মাধ্যমে তাদের অধিকার নিশ্চিত করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,


﴿ وَٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَلَا تُشۡرِكُواْ بِهِۦ شَيۡ‍ٔٗاۖ وَبِٱلۡوَٰلِدَيۡنِ إِحۡسَٰنٗا ٣٦ ﴾ [النساء: ٣٦]


“তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সাথে কিছু শরীক করো না ও পিতামাতার সাথে সদাচরণ করো”। [সূরা আন-নিসা: ৩৬]


তৃতীয়ত: ইসলামী শরী‘য়াহ বিশ্বব্যাপী ও সার্বজনীন:


ইসলামী শরী‘য়াহ কোনো নির্দিষ্ট স্থানের জন্য আসেনি যে সেখানকার রাষ্ট্র শুধু উক্ত ভূখণ্ডে তা বাস্তবায়ন করবে, কোনো মিশনের সাথেও নির্ভরশীল নয় যে মিশনটি শেষ হলে এটিও শেষ হয়ে যাবে। জমিনে যে স্থানে ও যে কালেই মানুষ পাওয়া যাবে ইসলামী শরী‘য়াহ তাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক, আক্বায়ীদ ও আইন কানুন ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এ বৈশিষ্ট্য শুধু মাত্র ইসলামী শরী‘য়াহ এর জন্যই খাস, কেননা এটা সৃষ্টিকুলের স্রষ্টা মহান আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এসেছে।


চতুর্থত: ইসলামী শরী‘য়াহ এর বিধানসমূহ আক্বীদার সাথে সম্পৃক্ত:


ইসলামী শরী‘য়াহর বিধানগুলো অনুসন্ধান করলে দেখা যায় যে, এর কতিপয় বিধান অর্থনীতি, কিছু সামাজিক, কিছু আখলাকী, কিছু লেনদেন যেমন, বেচাকেনা ও ভাড়া এবং কিছু অপরাধ ইত্যাদির সাথে সম্পৃক্ত। নানা ধরনের এ বিধানগুলোর সব কিছুই আক্বীদার সাথে গভীরভাবে সম্পর্ক রয়েছে। যেমন, যাকাত ইসলামের একটি রোকন, এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন,


﴿ قَدۡ أَفۡلَحَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ ١ ٱلَّذِينَ هُمۡ فِي صَلَاتِهِمۡ خَٰشِعُونَ ٢ وَٱلَّذِينَ هُمۡ عَنِ ٱللَّغۡوِ مُعۡرِضُونَ ٣ وَٱلَّذِينَ هُمۡ لِلزَّكَوٰةِ فَٰعِلُونَ ٤ ﴾ [المؤمنون: ١،  ٤]


“অবশ্যই মুমিনগণ সফল হয়েছে, যারা নিজদের সালাতে বিনয়াবনত। আর যারা অনর্থক কথাকর্ম থেকে বিমুখ। আর যারা যাকাতের ক্ষেত্রে সক্রিয়”। [সূরা আল-মু’মিনূন: ১-৪]


এছাড়াও অন্যান্য আহকামের ক্ষেত্রেও একই কথা। যেমন, সুদের ব্যাপারে আমরা দেখি এর সাথে ইসলামী আক্বীদার এক সুদূর প্রসারী প্রভাব রয়েছে, লেনদেনের ক্ষেত্রে সুদকে হারাম করেছে। আক্বীদার সাথে এর রয়েছে গভীর সম্পর্ক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,


قال : «ومن غش فليس منا»


“যে ধোঁকাবাজি করবে সে আমাদের দলভুক্ত নয়”।


চুরির শাস্তির আখলাকী ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি, এর সাথেও রয়েছে আক্বীদার সম্পর্ক। যেমন আল্লাহ বলেছেন,


﴿ وَٱلسَّارِقُ وَٱلسَّارِقَةُ فَٱقۡطَعُوٓاْ أَيۡدِيَهُمَا جَزَآءَۢ بِمَا كَسَبَا نَكَٰلٗا مِّنَ ٱللَّهِۗ وَٱللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٞ ٣٨ ﴾ [المائ‍دة: ٣٨]


“আর পুরুষ চোর ও নারী চোর তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও তাদের অর্জনের প্রতিদান ও আল্লাহর পক্ষ থেকে শিক্ষণীয় আযাবস্বরূপ”। [সূরা আল-মায়েদা: ৩৮]


এভাবেই ইসলামী শরী‘য়াহর আহকামগুলো মানুষের অন্তরের গভীরে শক্তি, কর্ম-প্রেরণা যোগায়।


পঞ্চমত: ইসলামী শরী‘য়াহ মানুষের অন্তরকে লালন পালন করে:


ইসলামী শরী‘য়াহর আহকাম আক্বীদার সাথে সম্পৃক্ত থাকা সত্ত্বেও ইসলাম মুসলমানের অন্তরে আল্লাহর ভয়-ভীতি বীজ বপন করে, যা মুসলিমকে বলপ্রয়োগ বা জোর ছাড়াই আল্লাহর বিধানসমূহ সন্তুষ্টচিত্তে ও নিজের পছন্দে মানতে সাহায্য করে। কেননা সে একথা উপলব্ধি করে যে, ইসলামী আইন মানা হচ্ছে দ্বীন ও আল্লাহর আনুগত্য পোষণ, পক্ষান্তরে মানব রচিত আইন মানতে মানুষ জালিয়াতি ও ছলচাতুরীর আশ্রয় নেয়। তারা মনে করেন যে, এ আইন মেনে চলা কোনো আনুগত্য করা নয় এবং এর থেকে ভেগে যাওয়া কোনো দোষ নয়।


ইসলামী শরী‘য়াহ মানুষের অন্তর গঠন ও একে পরিশোধন করতে অতুলনীয় ভাবে সফল হয়েছে। এটা আমরা দেখতে পাই মা‘য়েয রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর ঘটনায়, যখন তিনি যিনায় পতিত হলে তার অন্তর তাকে আল্লাহর ভয় সম্পর্কে সতর্ক করে। ফলে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গেলেন, তিনি তাঁর কাছে তাকে পরিশুদ্ধ করতে বললেন। ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে রজমের নির্দেশ দেন এবং তাকে রজম দেয়া হয়। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,


فَقَالَ: «اسْتَغْفِرُوا لِمَاعِزِ بْنِ مَالِكٍ»، قَالَ: فَقَالُوا: غَفَرَ اللهُ لِمَاعِزِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَقَدْ تَابَ تَوْبَةً لَوْ قُسِمَتْ بَيْنَ أُمَّةٍ لَوَسِعَتْهُمْ»


“তোমরা মা‘য়েয ইবন মালিকের জন্য ইসতিগফার করো, তারা বললেন, আল্লাহ মা‘য়েয ইবন মালিককে ক্ষমা করে দিন। অতঃপর  রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে এমন তওবা করেছে যে, যদি আমি তা আমার উম্মতের মধ্যে বণ্টন করি তবে তা যথেষ্ট হবে”।


লেনদেনের মধ্যে ইসলামী সুউচ্চ জীবন ও জাগ্রত অন্তর পাওয়া যায়। যা ইমাম আবু হানিফা রহ. এর ব্যবসায় প্রভাব ফেলে। তিনি তার ব্যবসায়িক অংশীদার হাফস ইবন আব্দুর রহমানকে কিছু কাপড় দিয়েছিলেন। তাকে জানিয়ে দেন যে, কাপড়গুলোতে কিছু ত্রুটি আছে। ফলে হাফস সেগুলো কিনে নেয় কিন্তু বিক্রি করার সময় ত্রুটি উল্লেখ করতে ভুলে যায়। তিনি ত্রুটিপূর্ণ কাপড়ে পূর্ণ মূল্য প্রদান করেন। বলা হয়ে থাকে যে, সে কাপড়ের মূল্য ত্রিশ হাজার বা পঁয়ত্রিশ হাজার দিরহাম ছিল। কিন্তু আবু হানিফা রহ. সে অর্থ নিতে অস্বীকার করলেন। তিনি তার সাথীকে উক্ত ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে বলেন, কিন্তু অনেক খোঁজার পরেও তাকে পাওয়া গেল না। তখন আবু হানিফা রহ. তার অংশীদারের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করেন। তিনি উক্ত সম্পদ তার মালের সাথে মিলাতে অস্বীকার করেন এবং তা দান করে দেন।


ইসলামী শরী‘য়াহয় এ ধরণের জীবন্ত অনুভূতি ইসলাম তার অনুসারীদেরকে শিক্ষা দিয়েছে, যা অন্যান্য আইনের চেয়ে অনেক শক্তিশালী, আসমানী শরী‘য়াহ যেমন মানুষের অন্তরে প্রভাব ফেলে মানব রচিত আইনে এরূপ কোনো প্রভাব নেই।


ইসলাম থেকে বিচ্যুত সমাজে যা কিছু ঘটছে এবং তাদের আইন কানুন সমাজে নিরাপত্তা, শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অপরাধ দমনে ব্যর্থতাই প্রমাণ করে ইসলামী শরী‘য়াহ বাস্তবায়ন কতোটা প্রয়োজন। আল্লাহ তা‘আলা যথার্থই বলেছেন,


﴿ وَمَنۡ أَحۡسَنُ مِنَ ٱللَّهِ حُكۡمٗا لِّقَوۡمٖ يُوقِنُونَ ٥٠ ﴾ [المائ‍دة: ٥٠]


“আর নিশ্চিত বিশ্বাসী কওমের জন্য বিধান প্রদানে আল্লাহর চেয়ে কে অধিক উত্তম? [সূরা আল-মায়েদা: ৫০]


ষষ্ঠত: ইসলামী শরী‘য়াহ সমতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত:


মানব রচিত আইন মানুষের মাঝে সমতা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয় না। ফলে রাষ্ট্রে প্রধান বা প্রধান মন্ত্রীকে জাতির অন্যান্য লোকদের উপর উচ্চ মর্যাদা দিয়ে থাকে। সংবিধানে রাষ্ট্রের প্রধানকে তার কৃত অপরাধের জবাবদিহিতা কাউকে দিতে হয় না। মানব রচিত আইন বিদেশী রাষ্ট্র প্রধান ও তাদের সফরসঙ্গীদের কৃত অপরাধের শাস্তি ক্ষমা করে দেয়। সাবেক দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক এ ভেদাভেদ  খুব করতেন। বিশাল কৃশাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মাঝে শ্বেতাঙ্গরাই বহু বছর শাসন করেছিলেন।


পক্ষান্তরে, ইসলামী শরী‘য়াহ চৌদ্দ শত বছর পূর্ব থেকেই সমতার বিচারে মানব রচিত অন্যান্য সব আইনের থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য মন্ডিত। ইসলামী শরী‘য়াহর দৃষ্টিতে দায়িত্ব, কর্তব্য ও অধিকারের ক্ষেত্রে সকলেই সমান। শাসক ও জনগণের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,


﴿ فَمَن يَعۡمَلۡ مِثۡقَالَ ذَرَّةٍ خَيۡرٗا يَرَهُۥ ٧ وَمَن يَعۡمَلۡ مِثۡقَالَ ذَرَّةٖ شَرّٗا يَرَهُۥ ٨ ﴾ [الزلزلة: ٧،  ٨]


“অতএব, কেউ অণু পরিমাণ ভালকাজ করলে তা  সে দেখবে, আর কেউ অণু পরিমাণ খারাপ কাজ করলে তাও সে দেখবে”। [সূরা আয্-যিলযাল: ৭-৮]


عَنِ المَعْرُورِ بْنِ سُوَيْدٍ، قَالَ: لَقِيتُ أَبَا ذَرٍّ بِالرَّبَذَةِ، وَعَلَيْهِ حُلَّةٌ، وَعَلَى غُلاَمِهِ حُلَّةٌ، فَسَأَلْتُهُ عَنْ ذَلِكَ، فَقَالَ: إِنِّي سَابَبْتُ رَجُلًا فَعَيَّرْتُهُ بِأُمِّهِ، فَقَالَ لِي النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا أَبَا ذَرٍّ أَعَيَّرْتَهُ بِأُمِّهِ؟ إِنَّكَ امْرُؤٌ فِيكَ جَاهِلِيَّةٌ»


“মা‘রূর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার রাবাযা নামক স্থানে আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সাক্ষাত করলাম। তখন তার পরনে ছিল এক জোড়া কাপড় (লুঙ্গি ও চাদর) আর তার চাকরের পরনেও ছিল ঠিক একই ধরনের এক জোড়া কাপড়। আমি তাকে এর (সমতার) কারণ জিজ্ঞাস করলাম। তিনি বললেন, একবার আমি এক ব্যক্তিকে গালি দিয়েছিলাম এবং আমি তাকে তার মা সম্পর্কে লজ্জা দিয়েছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, ‘আবু যর! তুমি তাকে তার মা সম্পর্কে লজ্জা দিয়েছ? তুমি তো এমন ব্যক্তি, তোমার মধ্যে জাহেলী যুগের স্বভাব রয়েছে”।


এক ইয়াহূদী ‘উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর দরবারে আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর বিরুদ্ধে অভিযোগ করল। তখন ‘উমর রাদিয়াল্লাহু আলী রাদিয়াল্লাহুকে বললেন, হে আবুল হাসান দাঁড়াও, তোমার প্রতিপক্ষের সামনে গিয়ে বসো। তিনি তাই করলেন ও তাঁর চেহারায় অনুসরণের প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছিল। বিচার কাজ শেষ হলে ‘উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে বললেন, হে আলী তুমি কি তোমার বিবাদীর সামনে বসতে অপছন্দ করেছ? তিনি উত্তরে বললেন, না, কখনো না। তবে আমি অপছন্দ করেছি এটা যে, আপনি নাম ডাকার ক্ষেত্রে দু’জনের মাঝে সমতা বজায় রাখেন নি, আমাকে আমার উপনাম আবুল হাসান বলেছেন; যেহেতু উপনামে ডাকা সম্মানের দিকে ইঙ্গিত করে।


ইসলামে উঁচু-নিচু ও শক্তিশালী-দুর্বল সকলের মাঝেই সমানভাবে শাস্তির বিধান বাস্তবায়ন করা হয়। এর চমৎকার উদাহরণ হলো আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত আল-মাখযুমিয়া এর হাদীস:


عَنْ عَائِشَةَ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا: أَنَّ قُرَيْشًا أَهَمَّتْهُمُ المَرْأَةُ المَخْزُومِيَّةُ الَّتِي سَرَقَتْ، فَقَالُوا: مَنْ يُكَلِّمُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَمَنْ يَجْتَرِئُ عَلَيْهِ إِلَّا أُسَامَةُ بْنُ زَيْدٍ، حِبُّ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَكَلَّمَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: «أَتَشْفَعُ فِي حَدٍّ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ» ثُمَّ قَامَ فَخَطَبَ، قَالَ: «يَا أَيُّهَا النَّاسُ، إِنَّمَا ضَلَّ مَنْ قَبْلَكُمْ، أَنَّهُمْ كَانُوا إِذَا سَرَقَ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ، وَإِذَا سَرَقَ الضَّعِيفُ فِيهِمْ أَقَامُوا عَلَيْهِ الحَدَّ، وَايْمُ اللَّهِ، لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، سَرَقَتْ لَقَطَعَ مُحَمَّدٌ يَدَهَا»


“আয়িশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, আল-মাখযুমী সম্প্রদায়ের জনৈকা মহিলার ব্যাপারে কুরাইশ বংশের লোকদের খুব দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল যে কিনা চুরি করেছিল। সাহাবা কিরামগণ বললেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে কে কথা বলতে পারবে? আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় পাত্র উসামা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ছাড়া কেউ এ সাহস পাবেন না। তখন উসামা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে কথা বললেন: এতে তিনি বললেন, তুমি আল্লাহ তা‘য়াআলার দেওয়া শাস্তির বিধানের ক্ষেত্রে সুপারিশ করছ? এরপর তিনি দাঁড়িয়ে খুতবা প্রদান করলেন এবং বললেন, হে মানব মণ্ডলী! নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী সম্প্রদায়ের লোকেরা পথভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছে। কেননা কোনো সম্মানিত লোক যখন চুরি করত তখন তারা তাকে রেহাই দিয়ে দিত। আর যখন কোনো দুর্বল লোক চুরি করত তখন তার উপর শরী‘য়তের শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম! মুহাম্মদ এর কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করে তবে অবশ্যই মুহাম্মদ তার হাত কেটে দেবে”।


 


 


চতুর্থ পরিচ্ছেদ


ইসলামী শরী‘য়াহ সহজ সরল হওয়ার দলিলসমূহ


 


প্রথমত: আল-কুরআনুল কারীম থেকে দলিল:


﴿ لَا يُكَلِّفُ ٱللَّهُ نَفۡسًا إِلَّا وُسۡعَهَاۚ لَهَا مَا كَسَبَتۡ وَعَلَيۡهَا مَا ٱكۡتَسَبَتۡۗ رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذۡنَآ إِن نَّسِينَآ أَوۡ أَخۡطَأۡنَاۚ رَبَّنَا وَلَا تَحۡمِلۡ عَلَيۡنَآ إِصۡرٗا كَمَا حَمَلۡتَهُۥ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِنَاۚ رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلۡنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِۦۖ ٢٨٦ ﴾ [البقرة: ٢٨٦]


“আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না। সে যা অর্জন করে তা তার জন্যই এবং সে যা কামাই করে তা তার উপরই বর্তাবে। হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই, অথবা ভুল করি তাহলে আপনি আমাদেরকে পাকড়াও করবেন না। হে আমাদের রব, আমাদের উপর বোঝা চাপিয়ে দেবেন না, যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে এমন কিছু বহন করাবেন না, যার সামর্থ্য আমাদের নেই”। [সূরা আল-বাকারাহ: ২৮৬]


হ্যাঁ, আল্লাহ তা‘আলা কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না। এটা সৃষ্টির উপর মহান আল্লাহর দয়া ও তাদের প্রতি তাঁর উদারতা। তিনি তাঁর দয়া ও অনুগ্রহের কারণে আমাদের উপর এমন কোনো বোঝা চাপিয়ে দেন নি যা পালন করা আমাদের জন্য কষ্টকর, যেমনি ভাবে তিনি পূর্ববর্তীদের উপর তাদের নিজেরা নিজেদেরকে হত্যা ও ও কাপড় বা শরীরের কোনো স্থানে অপবিত্র লাগলে সে স্থান কেটে ফেলা ইত্যাদি কষ্টকর দায়িত্ব দিয়েছেন। বরং তিনি আমাদেরকে সহজ করেছেন, আমাদের উপর থেকে বোঝা সরিয়ে দিয়েছেন, যা তিনি পূর্ববর্তীদের উপর তাদের সীমালঙ্ঘনের কারণে চাপিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন,


﴿ يُرِيدُ ٱللَّهُ بِكُمُ ٱلۡيُسۡرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ ٱلۡعُسۡرَ ١٨٥ ﴾ [البقرة: ١٨٥]


“আল্লাহ তোমাদের সহজ চান এবং কঠিন চান না”। [সূরা আল-বাকারাহ: ১৮৫]


ইমাম সুয়ূতী রহ. বলেন, এ আয়াতটি একটি মূল বড় কায়েদা যার উপর ভিত্তি করে ইসলামী শরী‘য়াহ এর আদেশ নিষেধ তথা বান্দাহর দায়-দায়িত্ব বর্তায়। এটি হলো সহজতা, এতে কোনো কঠোরতা নেই, ক্ষমা ও মার্জনা আছে, নিষ্ঠুরতা নেই, সহজতা আছে, জটিলতা নেই। এটি একটি অনেক বড় কায়েদা যার উপর ভিত্তি করে অনেক নীতিমালা নির্ণয় করা হয়। সেগুলো হলো:


«أن المشقة تجلب التيسير» ‘কষ্ট সহজী করণ কামনা করে’। এটি ফিকহের প্রসিদ্ধ পাঁচটি কায়েদার একটি।


আরেকটি কায়েদা হলো:


«الضرورات تبيح المحظورات» ‘প্রয়োজন নিষিদ্ধ জিনিসকে (প্রয়োজন অনুসারে) বৈধ করে’।


আরেকটি কায়েদা হলো: «إذا ضاق الأمر اتسع» ‘যখন বিষয়টি সংকীর্ণ হয়ে যায়, তখন তা (সহজতা আরোপের জন্য) বিস্তৃত হয়’।


ইবন কাসীর রহ. বলেছেন,


﴿ وَمَا جَعَلَ عَلَيۡكُمۡ فِي ٱلدِّينِ مِنۡ حَرَجٖۚ ٧٨ ﴾ [الحج: ٧٨]


“দ্বীনের ব্যাপারে তিনি তোমাদের উপর কোনো কঠোরতা আরোপ করেননি”। [সূরা আল-হাজ্ব: ৭৮] এ বাণীর অর্থ - তোমাদের সাধ্যের বাইরে তিনি কোনো বিধান আরোপ করেননি, তোমাদেরকে উত্তরণের পথ দেখানো ব্যতীত তিনি কোনো কষ্টকর আদেশ তোমাদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় করেন নি।


উদাহরণ স্বরূপ সালাতের কথা বলা যায়, যা শাহাদাতান তথা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাক্ষ্য দানের পরে ইসলামে সবচেয়ে বড় রোকন। মুকিম অবস্থায় তা চার রাকা‘আত আদায় করতে হয়,  মুসাফির অবস্থায় তা কসর করে দুই রাকা‘আত পড়তে হয়, আর ভয় ভীতির সময় কোনো কোনো ইমামের মতে কিবলা-মুখী হয়ে বা সম্ভব না হলে কিবলা-মুখী না হয়ে এক রাকা‘আত আদায় করতে হয়। এটাই ইসলামী শরী‘য়াহ এর সহজ ও উদার হওয়ার উৎকৃষ্ট প্রমাণ।


দ্বিতীয়ত: সুন্নাহ থেকে ইসলামী শরী‘য়াহ সহজ সরল হওয়ার দলিল:


১- ইমাম আহমদ রহ. তার মুসনাদে উল্লেখ করেন,


عَنْ أَبِي أُمَامَةَ قَالَ: خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي سَرِيَّةٍ مِنْ سَرَايَاه، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنِّي لَمْ أُبْعَثْ بِالْيَهُودِيَّةِ وَلَا بِالنَّصْرَانِيَّةِ، وَلَكِنِّي بُعِثْتُ بِالْحَنِيفِيَّةِ السَّمْحَةِ »


আবু উমামা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা একবার এক সারিয়া (ছোট অভিযান) এ বের  হলাম। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি ইহুদি ও নাসারাদের আদর্শ (তাদের মত বাড়াবাড়ি) নিয়ে প্রেরিত হই নি, বরং আমি সরল সঠিক ও উদারপন্থী হয়ে প্রেরিত হয়েছি”।


২- বুখারীতে বর্ণিত আছে,


عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، أَنَّهَا قَالَتْ: «مَا خُيِّرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْنَ أَمْرَيْنِ إِلَّا أَخَذَ أَيْسَرَهُمَا، مَا لَمْ يَكُنْ إِثْمًا، فَإِنْ كَانَ إِثْمًا كَانَ أَبْعَدَ النَّاسِ مِنْهُ، وَمَا انْتَقَمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِنَفْسِهِ إِلَّا أَنْ تُنْتَهَكَ حُرْمَةُ اللَّهِ، فَيَنْتَقِمَ لِلَّهِ بِهَا»


“আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখনই দু’টি জিনিসের একটি গ্রহণের ইখতিয়ার দেওয়া হতো, তখন তিনি সহজ সরলটিই গ্রহণ করতেন যদি তা গোনাহ না হতো। যদি গোনাহ হতো তবে তা থেকে তিনি সবচেয়ে বেশী দূরে সরে থাকতেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যক্তিগত কারণে কারো থেকে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেন নি। তবে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা লঙ্ঘন করা হলে আল্লাহকে রাযী ও সন্তুষ্ট করার জন্য তিনি প্রতিশোধ নিতেন”।


হাফেয ইবন হাজার রহ. বলেছেন, “ইসলাম একটি সহজ সরল দ্বীন। পূর্ববর্তী দ্বীনসমূহের তুলনায় এ দ্বীনকে সহজ বলা হয়েছে। কেননা আল্লাহ এ উম্মত থেকে বোঝা উঠিয়ে নিয়েছেন যা তিনি পূর্ববর্তীদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন।


এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো, তাদের তওবার বিধান ছিল নিজেকে নিজে হত্যা করা, আর এ উম্মতের তওবা হলো পাপ থেকে বিরত থাকা, দৃঢ় প্রত্যয়ী হওয়া ও অনুশোচনা করা”।


 


 


 


পঞ্চম পরিচ্ছেদ


ইসলামী শরী‘য়াহ বাস্তবায়নের হুকুম


আল্লাহর প্রতি ঈমান ও তাঁর একত্ববাদে বিশ্বাস এটাই দাবী যে, আমরা ঈমান আনব যে, তিনি আসমান ও জমিন ও এ দুয়ের মধ্যকার সব কিছুরই মালিক। সৃষ্টি জগতের সব কিছু তাঁরই অধীনে। তিনি ছাড়া অন্য কেউ সৃষ্টির রহস্য ও পরিচালনা ব্যবস্থা জানেন না বা কেউ এ কাজে তাঁর সাথে শরিক নাই।


সৃষ্টি ও পরিচালনা যেহেতু একমাত্র মহান আল্লাহর তাই আদেশ ও হুকুমও একমাত্র তাঁরই হবে। বান্দাহ তাঁর নির্দেশের ও তাঁর হুকুমের অনুগত। এটাই উবুদিয়াতের বা দাসত্বের দাবী। সে তাঁরই অনুগত, বশীভূত ও তাঁরই আদেশ-নিষেধ মান্যকারী।


আল-কুরআন অনেক আয়াতে আল্লাহ তা‘আলার উলুহিয়্যাত তথা ইলাহ হওয়ার হাকীকত বর্ণনা করেছে। যেমন আল্লাহ বলেছেন,


﴿ وَهُوَ ٱللَّهُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۖ لَهُ ٱلۡحَمۡدُ فِي ٱلۡأُولَىٰ وَٱلۡأٓخِرَةِۖ وَلَهُ ٱلۡحُكۡمُ وَإِلَيۡهِ تُرۡجَعُونَ ٧٠ ﴾ [القصص: ٧٠]


“আর তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই। দুনিয়া ও আখিরাতে সমস্ত প্রশংসা তাঁরই; বিধান তাঁরই। আর তাঁর কাছেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে”। [সূরা আল-কাসাস: ৭০]


আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা আরো বলেছেন,


﴿ لَوۡ كَانَ فِيهِمَآ ءَالِهَةٌ إِلَّا ٱللَّهُ لَفَسَدَتَاۚ فَسُبۡحَٰنَ ٱللَّهِ رَبِّ ٱلۡعَرۡشِ عَمَّا يَصِفُونَ ٢٢ ﴾ [الانبياء: ٢٢]


“যদি আসমান ও জমিনে আল্লাহ ছাড়া বহু ইলাহ থাকত তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত, সুতরাং তারা যা বলে, আরশের রব আল্লাহ তা থেকে পবিত্র।”[সূরা আল-আম্বিয়া: ২২]


এ আয়াতগুলো মূল ভাব সাব্যস্ত করে। তা হলো, সৃষ্টি ও পরিচালনা একমাত্র মহান আল্লাহর হাতে, এর ফলে বান্দাহর সব বিষয় আল্লাহর কাছেই ন্যস্ত, তারা তাঁর হুকুমের অনুগত।


আল্লাহর ইবাদত মানে আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,


﴿ وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِي كُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولًا أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَۖ فَمِنۡهُم مَّنۡ هَدَى ٱللَّهُ وَمِنۡهُم مَّنۡ حَقَّتۡ عَلَيۡهِ ٱلضَّلَٰلَةُۚ فَسِيرُواْ فِي ٱلۡأَرۡضِ فَٱنظُرُواْ كَيۡفَ كَانَ عَٰقِبَةُ ٱلۡمُكَذِّبِينَ ٣٦ ﴾ [النحل: ٣٦]


“আর আমি অবশ্যই প্রত্যেক জাতিতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং পরিহার কর তাগূতকে। অতঃপর তাদের মধ্য থেকে আল্লাহ কাউকে হিদায়ত দিয়েছেন এবং তাদের মধ্য থেকে কারো উপর পথভ্রষ্টতা সাব্যস্ত হয়েছে। সুতরাং তোমরা যমীনে ভ্রমণ কর অতঃপর দেখ, অস্বীকারকারীদের পরিণতি কীরূপ হয়েছে”। [সূরা আন-নাহল: ৩৬]


ইবন কাসীর রহ. উপরিউক্ত আয়াতের তাফসীরে বলেছেন, আল্লাহ সব উম্মত তথা সব যুগে প্রত্যেক জাতির জন্য রাসূল প্রেরণ করেছেন। তারা সবাই আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকতেন। তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করতে নিষেধ করতেন।


অতঃএব আল্লাহ তা‘আলা বান্দাহকে একমাত্র তাঁর একনিষ্ঠ ইবাদত করতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাগুতের অনুরসণ করতে নিষেধ করেছেন, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদের আনুগত্য করে। চাই সেগুলো মূর্তি হোক বা তাদের নেতা হোক যাদেরকে অনুসরণ করতে আল্লাহ নির্দেশ দেন নি। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,


﴿ أَلَمۡ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ يَزۡعُمُونَ أَنَّهُمۡ ءَامَنُواْ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡكَ وَمَآ أُنزِلَ مِن قَبۡلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوٓاْ إِلَى ٱلطَّٰغُوتِ وَقَدۡ أُمِرُوٓاْ أَن يَكۡفُرُواْ بِهِۦۖ وَيُرِيدُ ٱلشَّيۡطَٰنُ أَن يُضِلَّهُمۡ ضَلَٰلَۢا بَعِيدٗا ٦٠ ﴾ [النساء: ٦٠]


“তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যারা দাবী করে যে, নিশ্চয় তারা ঈমান এনেছে তার উপর, যা নাযিল করা হয়েছে তোমার প্রতি এবং যা নাযিল করা হয়েছে তোমার পূর্বে। তারা তাগূতের কাছে বিচার নিয়ে যেতে চায় অথচ তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাকে অস্বীকার করতে। আর শয়তান চায় তাদেরকে ঘোর বিভ্রান্তিতে বিভ্রান্ত করতে”। [সূরা আন-নিসা: ৬০]


যারা দাবী করে যে, তারা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও পূর্ববর্তী আম্বিয়াদের উপর যা নাযিল হয়েছে তাতে তারা ঈমান আনে; অথচ বিচার ফয়সালার ক্ষেত্রে তারা আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহ ছাড়া অন্যদের ফয়সালা মানে তাদের এ ধরনের কাজকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হয়েছে।   অতঃএব যারা আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাহ ছেড়ে অন্যের বিচার মানে তারা মূলত তাগুতেরই বিচার মানল।


আল্লাহর বিধান ব্যতীত অন্যের ফয়সালা মানা হলো অন্যায়, জুলুম, ভ্রষ্টতা, কুফুরী ও ফাসেকী। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন,


﴿ وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡكَٰفِرُونَ ٤٤ ﴾ [المائ‍دة: ٤٤]


“আর যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে ফয়সালা করে না, তারাই কাফির”। [সূরা আল-মায়েদা: ৪৪]


﴿  وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلظَّٰلِمُونَ ٤٥ ﴾ [المائ‍دة: ٤٥]


“আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম”। [সূরা আল-মায়েদা: ৪৫]


﴿وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡفَٰسِقُونَ ٤٧ ﴾ [المائ‍دة: ٤٧]


“আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করে না, তারাই ফাসিক”। [সূরা আল-মায়েদা: ৪৭]


দেখুন আল্লাহ কিভাবে উপরিউক্ত আয়াতে আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্যের হুকুম মানাকে কুফুরী, জুলুম ও ফাসেকী বলেছেন।


যে সব মুসলমান রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিচার মানে না আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে  বেঈমান বলেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,


﴿ فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ حَرَجٗا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمٗا ٦٥ ﴾ [النساء: ٦٥]


“অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজদের অন্তরে কোনো দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়”। [সূরা আন-নিসা: ৬৫]


 


 


 


ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ


আল্লাহর নাযিল কৃত বিধান ছাড়া অন্য বিধান অনুযায়ী শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করার কারণসমূহ ও এর ফলাফল


 


প্রথমত: আল্লাহর নাযিল কৃত বিধান ছাড়া অন্য বিধান অনুযায়ী শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করার কারণসমূহ:


 


প্রথম কারণ: ঈমান হীনতা বা ঈমানের দুর্বলতা:


অনেক মুসলমানের অন্তরে ঈমানের দুর্বলতাই সব ধরনের পথভ্রষ্টতা ও বিপথগামীতার মূল কারণ। এটা কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয় যে, আল্লাহর উপর ঈমান আনা ও ঈমানের দাবীর কেন্দ্রবিন্দুই হলো মুসলিম সে অনুযায়ী চলবে। বরং এটা তাকে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মান্য করা ও তার শরী‘য়াহ জীবনে বাস্তবায়ন করতে সক্রিয় কাজ করবে।


ব্যক্তির ঈমান যদি শুধু দাবী বা মুখে উচ্চরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে তাহলে বাস্তবে এতে কি লাভ। যেমন এ ধরনের ঈমান কোনো ফলাফল দিতে পারে না। ব্যক্তিকে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করাতে পারে না। এটা এক ধরনের মৃত্যু ঈমান যা তার অনুসারী শুধুই অনুসরণ করে থাকে। আল্লাহর কাছে এ ধরনের ঈমান থেকে পানাহ চাই। এটা তার অন্তরের ব্যধি যা ব্যক্তিকে আল্লাহর বিধান থেকে বিরত রাখে এবং সে মানব রচিত ব্যর্থ ও অসাড় বিধান মানে।   আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,


﴿ وَيَقُولُونَ ءَامَنَّا بِٱللَّهِ وَبِٱلرَّسُولِ وَأَطَعۡنَا ثُمَّ يَتَوَلَّىٰ فَرِيقٞ مِّنۡهُم مِّنۢ بَعۡدِ ذَٰلِكَۚ وَمَآ أُوْلَٰٓئِكَ بِٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٤٧ وَإِذَا دُعُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ لِيَحۡكُمَ بَيۡنَهُمۡ إِذَا فَرِيقٞ مِّنۡهُم مُّعۡرِضُونَ ٤٨ ﴾ [النور: ٤٧،  ٤٨]


“তারা বলে, ‘আমরা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি এবং আমরা আনুগত্য করেছি’, তারপর তাদের একটি দল এর পরে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আর তারা মুমিন নয়। আর যখন তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি এ মর্মে আহবান করা হয় যে, তিনি তাদের মধ্যে বিচারমীমাংসা করবেন, তখন তাদের একটি দল মুখ ফিরিয়ে নেয়”। [সূরা আন-নূর: ৪৭-৪৮]


দ্বিতীয় কারণ: কাফেরদের চাটুকারিতা ও তাদের উপর নির্ভরশীলতা:


ইসলাম তার দুষ্কৃতি ও হিংসুক শত্রুদের সর্বদা মোকাবিলা করেছে, চাই তারা সমাজতান্ত্রিক কাফির হোক বা আল্লাহর লা‘আনতপ্রাপ্ত ইয়াহূদী। এরা সবাই ইসলাম ও মুসলমানের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, কতিপয় লোক তাদের সাথে মিশে কাজ করে আর নিজেকে ইসলামের দিকে সম্পৃক্ত করে। তাদের উদ্দেশ্য হলো মানব রচিত আইনের অনুসারীদের অনুসরণ করা। তারা ঐ শ্রেণির লোক যারা পশ্চাত্যে শিক্ষা গ্রহণ করে তাদের চিন্তা চেতনা ও মতবাদ লালন পালন করে। তাদের ধর্ম নিরপেক্ষতা সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ, ইয়াহূদীবাদ ইত্যাদি মতবাদে রূপান্তরিত হয়। তারা তাদের শ্লোগানে কণ্ঠ উঁচু করে, তাদের মূলধারার দিকে আহ্বান করে এবং লোকজনকে তাদের মতের উপর চলতে বলে। এ সব লোক অমুসলিমদের কাছেই বেশী নিকটবর্তী। কেননা তারা কাফিরদের কাজ করে আর এরা মুসলমান নয়। যদিও তারা মুখে লক্ষবার মুসলমান দাবী করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,


﴿ لَّا يَتَّخِذِ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ ٱلۡكَٰفِرِينَ أَوۡلِيَآءَ مِن دُونِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَۖ وَمَن يَفۡعَلۡ ذَٰلِكَ فَلَيۡسَ مِنَ ٱللَّهِ فِي شَيۡءٍ إِلَّآ أَن تَتَّقُواْ مِنۡهُمۡ تُقَىٰةٗۗ وَيُحَذِّرُكُمُ ٱللَّهُ نَفۡسَهُۥۗ وَإِلَى ٱللَّهِ ٱلۡمَصِيرُ ٢٨ ﴾ [ال عمران: ٢٨]


“মুমিনরা যেন মুমিনদের ছাড়া কাফিরদেরকে বন্ধু না বানায়। আর যে কেউ এরূপ করবে, আল্লাহর সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে যদি তাদের পক্ষ থেকে তোমাদের কোনো ভয়ের আশঙ্কা থাকে। আর আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর নিজের ব্যাপারে সতর্ক করছেন এবং আল্লাহর নিকটই প্রত্যাবর্তন”। [সূরা আলে-‘ইমরান: ২৮]


তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করার ব্যাপারে এটি একটি সার্বজনীন নিষেধাজ্ঞা। তাদেরকে সাহায্যকারী, বন্ধু ও অভিভাবক গ্রহণ করা ও তাদের ধর্মে দীক্ষিত হওয়া সব কিছুই এ নিষেধাজ্ঞার শামিল।


শাইখ সুলাইমান ইবন আব্দুল্লাহ আলে আশ-শাইখ রহ. মুশরিকদের সাথে বন্ধুত্বের হুকুম বর্ণনায় বলেন, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম, জেনে রাখো – আল্লাহ তোমার উপর রহমত করুন- মানুষ যখন মুশরিকদের দ্বীনের সাথে একমত পোষণ করে, তাদের ভয়ে তাদেরকে বন্ধু হিসেবে মানে, তাদের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য তাদেরকে তোষামোদ ও চাটুকারিতা করে তাহলে নিঃসন্দেহে সে তাদের মতই কাফির, যদিও সে তাদেরকে ও তাদের ধর্মকে অপছন্দ করে এবং ইসলাম ও মুসলমানকে ভালবাসে। আর এটা হলো যখন তাদের (মুশরিকদের) পক্ষ থেকে কোনো ধরনের চাপ না থাকবে। আর যদি মুসলমানরা তাদের প্রতিরক্ষায় থাকে, তারা (মুশরিকরা) তাদের আনুগত্য করতে বাধ্য করে, মুসলমানরা তাদের বাতিল ধর্মের সাথে ঐকমত পোষণ করে, তাদেরকে সাহায্য ও বন্ধুত্বের মাধ্যমে সহযোগিতা করে, মুসলমানদের সাথে বন্ধুত্ব ছিন্ন করে, তাহলে তারা ইখলাস ও তাওহীদের সৈনিকের পরিবর্তে কাফির মুশরিকদের দলে অন্তর্ভুক্ত হলো। কারো অবস্থা এরূপ হলে সে নিঃসন্দেহে কাফির, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের চরম শত্রু।


অধিকাংশ ইসলামী দেশে কাফিরদেরকে অভিভাবক ও তাদের চাটুকারিতার স্পষ্ট আলামত হচ্ছে:


মানব রচিত সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করা। এটা দুর্বল ঈমান বা ঈমান হীনতার ফলাফল।


তৃতীয় কারণ: ইসলামী শরী‘য়াহ সম্পর্কে অজ্ঞতা:


বর্তমানে অধিকাংশ মুসলমান ইসলামকে জন্মসূত্রে পেয়েছে। তাদের বাপ দাদাকে এ ধর্মে পেয়েছে। যার ফলে মুসলিম উম্মাহর নেতা হোক বা সাধারণ অনুসারী হোক অনেকের কাছেই ইসলামী শরী‘য়াহর বিধিবিধান অজানা। এমনকি তাদের অনেকেই নিজেদের ধর্মের নাম ছাড়া কিছুই জানে না। তারা তাদের ধর্মের আহকাম, ‘আকাইদ, আখলাক ও আদাব সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না। এতে করে অতি সহজেই আল্লাহর শত্রুরা তাদেরকে পথভ্রষ্ট ও তাদের বিষাক্ত ছোবল ছড়াতে সক্ষম হয়।


এখানে মুসলিম উম্মাহর সন্তানদের প্রচলিত কিছু অজ্ঞতার নমুনা পেশ করলাম। তাদের একদলকে মানবরূপী শয়তান এমনভাবে ভ্রষ্ট করেছে যে, তারা বলে ইসলামী শরী‘য়াহ বাস্তবায়ন যোগ্য। এ ধরনের লোক বার দুইভাগে বিভক্ত:


-একদল ইসলামী শরী‘য়াহ ও এর বিধিবিধান সম্পর্কে কিছু জানে না, কিন্তু তারা কিছু সুবিধাবাদী খবিশদের কাছে শিক্ষা পেয়েছে যে, ধর্ম হলো পশ্চাদগামীতা, অধঃপতন, সীমাবদ্ধতা ও পশ্চাদমুখিতা। সভ্য-সংস্কৃতি, উন্নতি ও অগ্রসর হওয়ার একমাত্র উপায় হলো সম্পূর্ণরূপে ধর্মহীন হওয়া।


- আরেক দল আছে যারা ইসলামী শরী‘য়াহর কিছুই পড়ে নি, তবে তারা শুধু সাধারণ আইন পড়েছে। মুসলমানদের সন্তানদেরকে শিক্ষা দীক্ষার জন্য এমন লোকদেরকে নিয়োগ দেয়া হয় যারা ইসলামের হাক্বিকত সম্পর্কে কিছুই জানে না। বরং তারা এ ধর্ম সম্পর্কে কিছু অপবাদ ও সন্দেহ সংশয় জানে যা তাদের অন্তরে সর্বদা ঘুরপাক খায়।


-আরেকটি দল আছে যাদেরকে মুসলমানদের ধ্বংস করার জন্য নিয়োজিত করা হয়েছে। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র ইত্যাদির নামে তাদেরকে রাস্তাঘাটে বের করা হয়েছে। এগুলো ইসলামী সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কৌশল হিসেবে কাজ করছে। ফলে ইসলামী সমাজের ভিত্তি নড়বড় ও ধ্বংস হয়ে যায়।


বর্তমানে কিছু সাধারণ লোকের সরলতা ও অজ্ঞতার কারণে এমনকি কিছু আলিমেরও সরলতা ও অজ্ঞতার কারণে তারা শির্কে পতিত হয়ে যায়। প্রমাণস্বরূপ বলা যায় কিছু আরবী ও ইসলামী দেশে দেখা যায় যে, তারা কবর ও দর্শনীয় স্থানে গিয়ে মাথা পেতে থাকে (সিজদা করে), মৃত্যু ব্যক্তির কাছে প্রার্থনা করে, তাদের কাছে কল্যাণ কামনা করে ও অকল্যাণ থেকে মুক্তি চায় ইত্যাদি।


 


দ্বিতীয়ত: আল্লাহর শরী‘য়াহ বাস্তবায়ন না করার বিরূপ প্রতিক্রিয়াসমূহ:


 


প্রথম প্রতিক্রিয়া: আক্বিদার ক্ষেত্রে:


আল্লাহর শরী‘য়াহ থেকে দূরে থাকা ও এর বিধিবিধান যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করার সবচেয়ে মারাত্মক বিপদ হলো ব্যক্তির আক্বিদা নষ্ট হওয়া ও তার আক্বিদার সাথে পার্থিব নোংরামি যুক্ত হওয়া যা তার অন্তরে সন্দেহ ও কুফুরীর সৃষ্টি করে।


দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়া: ইবাদতের ক্ষেত্রে:


অনেক মুসলমানের কাছে ইবাদতের মধ্যে নানা কুসংস্কার ও ভুল বুঝা বুঝির সৃষ্টি হয়। যেমন:


- ইবাদত আদায়ের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি ও কমতি করা, ইবন ‘উকাইল রহ. এটিকে খুব সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন, “তোমাদের বিষয়গুলো কতই না আশ্চর্যের, হয়ত তোমরা কামনার অনুসরণ করো, নতুবা নিজেদের আবিষ্কৃত (বিদ‘আত) বৈরাগ্যবাদের অনুসরণ করো”।


তৃতীয় প্রতিক্রিয়া: সামাজিক ক্ষেত্রে:


বহিরাগত ডান বা বামপন্থী সব ধরণের আমদানিকৃত ব্যবস্থা মানুষকে সুখ শান্তি ও নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং এগুলো মানব জাতির দুর্ভোগ ও দুশ্চিন্তার কারণ। ফলে পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন ও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, পারিবারিক সম্পর্ক বিনষ্ট হচ্ছে, মূল্যবোধ ও উত্তম আখলাক বিলুপ্ত হচ্ছে। আল্লাহর শরী‘য়াহ অস্বীকারকারী সমাজের সদস্যরা অস্থিরতা, পেরেশানি ও নিরাশায় ভুগছে। এ সবের ফলে সমাজে মানসিক রোগ, আত্মহত্যার হার বৃদ্ধি, মদ্যপান, মাতলামি, অতিরিক্ত ধূমপান, নিষিদ্ধ কাজে জড়ানো, যৌন হয়রানি ও অসামাজিক কাজে লিপ্ত হওয়া ইত্যাদি  বাড়ছে।


চতুর্থ প্রতিক্রিয়া: রাজনৈতিক ও বিচার ব্যবস্থায় এর প্রভাব:


ইসলামে ন্যায় বিচার সার্বজনীন, বড় ছোট, অভিজাত অনভিজাত, শাসক প্রজা ও মুসলিম অমুসলিম সকলের জন্যই সমান। এতে কোনো শর্ত ও ব্যতিক্রম নেই। প্রত্যেক ব্যক্তি ও শ্রেণির জন্যই সমধিকর। শাসক ও জনগণ সবার জন্য সমান অধিকার। অধিকার ও দায়িত্ব কর্তব্যের ক্ষেত্রেও সবার মাঝে সমঅধিকার।


ইসলামী শরী‘য়ায় জ্ঞানী, বুদ্ধিমান, অভিজ্ঞ ও দক্ষ লোকদের সমন্বয়ে গঠিত শূরা ব্যবস্থা একটি অনন্য ব্যবস্থাপনা। এটা ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার মূল ভিত্তি, কিন্তু এ ব্যবস্থা কতিপয় শাসকগোষ্ঠীর খামখেয়ালী, স্বৈরতন্ত্র ও তাদের রচিত আইনের কারণে বিনষ্ট হয়েছে। এ কারণে মুসলিম জাতি অনেক দুর্ভোগ ও কষ্ট সহ্য করেছে।


শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়াহ রহ. বলেছেন,


“যখন শাসকেরা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে বিধান থেকে সরে যাবে তখন তাদের মাঝে দুঃখ দুর্দশা নেমে আসবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,


قال : «وما حكم قوم بغير ما أنزل الله إلا وقع بأسهم بينهم».


“কোনো জাতির মধ্যে আল্লাহর নাযিল কৃত বিধান ছাড়া ফয়সালা করলে তাদের মাঝে দুঃখ দুর্দশা নেমে আসবে”।


আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান ছাড়া ফয়সালা করা রাষ্ট্রের ভাগ্য পরিবর্তনের কারণ, যা অতীত ও বর্তমানে অনেক বারই ঘটেছে। যে শান্তি চায় সে যেন অন্যের থেকে শিক্ষা নেয়, আল্লাহ যাকে সাহায্য করেছে তার পথে যেন চলে, তিনি যাকে অপমান ও অপদস্থ করেছে তার পথ থেকে যেন বিরত থাকে। কেননা আল্লাহ তা‘আলা মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে  বলেছেন,


﴿ وَلَيَنصُرَنَّ ٱللَّهُ مَن يَنصُرُهُۥٓۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ ٤٠ ٱلَّذِينَ إِن مَّكَّنَّٰهُمۡ فِي ٱلۡأَرۡضِ أَقَامُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتَوُاْ ٱلزَّكَوٰةَ وَأَمَرُواْ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَنَهَوۡاْ عَنِ ٱلۡمُنكَرِۗ وَلِلَّهِ عَٰقِبَةُ ٱلۡأُمُورِ ٤١ ﴾ [الحج: ٤٠،  ٤١]


“আর আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করেন, যে তাকে সাহায্য করে। নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী। তারা এমন যাদেরকে আমি যমীনে ক্ষমতা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজের আদেশ দেবে ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে; আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহরই অধিকারে”।  [সূরা আল-হাজ্জ: ৪০-৪১]


আল্লাহ ওয়াদা করেছেন তিনি অবশ্যই তাকে সাহায্য করেন, যে তাকে সাহায্য করে। তিনি তাঁর কিতাব, দ্বীন, ও রাসূলকে সাহায্য করেছেন। যে আল্লাহর নাযিল কৃত বিধান ছাড়া ফয়সালা করে ও না জেনে কথা বলে তাকে আল্লাহ সাহায্য করেন না।


মূলকথা হলো, যে সব দেশে আল্লাহর বিধান ছাড়া মানব রচিত বিধান দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে সেখানে সর্বত্রই ফিতনা ফাসাদ ও বিশৃঙ্খলা লেগেই থাকে। তখন শাসকেরা অস্ত্রের জোরে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে। তাদের ক্ষমতার মসনদ টিকে থাকে গোলা বারুদ, অগ্নি আর দুষ্কৃতি রাজনৈতিক লোকদের দ্বারা, চাই তারা সরকারী দলের হোক বা বিরোধী দলের, তারা সকলেই ধর্মনিরপেক্ষ।


পঞ্চম প্রতিক্রিয়া: অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে:


আল্লাহর বিধান ছাড়া মানব রচিত বিধান দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করায় জাতি ও শ্রেণির মাঝে ভেদাভেদ, সমাজে যুলুম অত্যাচার, যুদ্ধাপরাধ, মজুতদারিতা, দরিদ্রতা ও বেকারত্ব ইত্যাদি সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। জাতির নেতৃস্থানীয় ও ছোট বড় সবাই দুশ্চরিত্র হচ্ছে। ফলে তাদের মধ্যে নিফাক ও সুদ বেড়ে চলছে, আখলাক ও সম্মানবোধ হারিয়ে যাচ্ছে। তাদের মাঝে দায়িত্ববোধ, মূল্যবোধ ও আখলাক বলতে সামান্য বাকি থাকে।


 


 


সপ্তম পরিচ্ছেদ


ইসলামী শরী‘য়াহর বিরুদ্ধে কতিপয় অপবাদ ও দ্বিধা সংশয় এবং এগুলোর অপনোদন।


ইসলামের শুরু থেকেই শিরক ও কুফুরী শক্তি ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অপবাদ দিয়ে আসছে। ইসলামের শক্তিকে নস্যাৎ করতে ও এর দাওয়াতি মিশনকে শেষ করতে তারা নানা চক্রান্ত ও দ্বিধা সংশয় করে আসছে। কিন্তু ইসলাম তো ইসলামই। একে কোনো শক্তি বা মতবাদ নিঃশেষ করতে পারবে না। যুগ যুগ ধরে চলমান কোনো যুদ্ধে তাকে পরাজিত করতে পারেনি।


ইসলামের শত্রুরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে ও বার বার তারা পরাজয়ের গ্লানি ভোগ করেছে। অবশেষে তারা চিন্তা ভাবনা করে দেখেছে যে, মুসলমানদের বিজয় ও উন্নতির মূল কারণ হলো তাদের দ্বীন। ইসলাম তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করেছে। তাই ইসলামের শত্রুরা ইসলামকে ধ্বংস করতে একত্রিত হয়েছে। তারা ইসলামকে বিকৃতি ও এর মাঝে সংশয় ঢুকাতে এক মহাপরিকল্পনা করেছে। তারা অন্যায়ভাবে নানা অপবাদ দিয়ে ইসলামের প্রকৃত রূপকে বিকৃত করছে।


এখানে ইসলাম বিদ্বেষীদের কিছু ভ্রান্ত অপবাদ উল্লেখ করব যা তারা ইসলামের ব্যাপারে করে থাকে। অতঃপর এর প্রত্যেকটির মুখোশ উন্মোচন করে সেগুলোর মিথ্যাচার ও ভ্রান্ততা প্রমাণ করব।


প্রথম সংশয়:


তারা বলেন, ইসলামী শরী‘য়াহর বাস্তবায়ন অমুসলিম সংখ্যালঘুদের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে, মানুষের অন্তরে সাম্প্রদায়িক হিংসা বিদ্বেষ বৃদ্ধি পাবে, যা জাতিকে নানা দলে বিচ্ছিন্ন করবে। জাতির জন্য কল্যাণকর ও এ ব্যাধি থেকে বাঁচার উপায় হলো মানব রচিত সংবিধান অনুযায়ী সমাজ পরিচালনা করা, যেখানে আক্বিদা বা দ্বীনের কোনো সম্পর্ক নেই। যেখানে মানুষ নানা মত পোষণ করবে।


তারা ইসলামী শরী‘য়াহর ব্যাপারে অপবাদ দেয় যে, এটা অমুসলিম সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করে না। তাদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে, তাদেরকে মানুষ হিসেবে সম্মানজনক ভাবে বেঁচে থাকার মানবাধিকার চর্চা করতে দেয় না।  কিন্তু তারা একথা নিশ্চিতভাবেই জানে যে, এটা শুধুই মিথ্যা অপবাদ। ইতিহাস তাদের এ অপবাদ মিথ্যা সাব্যস্ত করে, যখন থেকে মুসলমানরা বিভিন্ন রাষ্ট্র বিজয় করেছে তাতে সংখ্যালঘু ছিল। বরং তাদের মধ্যে যারা ন্যায়নীতিবান, গোঁড়ামির কারণে ইসলামকে অপবাদ দেয় না তারাও এ সব অপবাদ মিথ্যা প্রতিপন্ন করেন।


আল-কুরআনের বিভিন্ন আয়াত তাদের এ অপবাদ মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,


﴿ لَآ إِكۡرَاهَ فِي ٱلدِّينِۖ قَد تَّبَيَّنَ ٱلرُّشۡدُ مِنَ ٱلۡغَيِّۚ ٢٥٦ ﴾ [البقرة: ٢٥٦]


“দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। নিশ্চয় হিদায়াত স্পষ্ট হয়েছে ভ্রষ্টতা থেকে”। [সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৫৬]


যেখানে অন্যান্য ধর্মের প্রধানরা তাদের অনুসারীদেরকে মানুষকে তাদের ধর্মে দীক্ষিত করতে জোরালো নির্দেশ দেয়, সেখানে আমরা দেখি ইসলাম কাউকে এ ধর্মে দীক্ষিত হতে  জবরদস্তি করে না। বরং ইসলাম তার ছায়াতলে অন্যান্য মানুষকে তাদের আক্বিদা নিয়ে স্বাধীনভাবে থাকতে আহ্বান করে।


আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলেছেন,


﴿ وَلَوۡ شَآءَ رَبُّكَ لَأٓمَنَ مَن فِي ٱلۡأَرۡضِ كُلُّهُمۡ جَمِيعًاۚ أَفَأَنتَ تُكۡرِهُ ٱلنَّاسَ حَتَّىٰ يَكُونُواْ مُؤۡمِنِينَ ٩٩ ﴾ [يونس: ٩٩]


“আর যদি তোমার রব চাইতেন, তবে যমীনের সকলেই ঈমান আনত। তবে কি তুমি মানুষকে বাধ্য করবে, যাতে তারা মুমিন হয় ?” [সূরা ইউনুস: ৯৯]


আল্লাহর কোনো নবী রাসূল মানুষকে জোর করে ঈমান আনতে বলেননি, এটা করা তাদের কাজও না। রিসালাতের কাজ এটা নয় যে, তারা জবরদস্তি করে মানুষকে ঈমানের পথে আনবে। ইসলামে জবরদস্তি করা নিষিদ্ধ, কেননা এতে কোনো ফল হয় না। ইসলামে তাদের স্বাধীনতার অন্যতম নিদর্শন হলো আহলে কিতাব ইয়াহুদি ও নাসারাদের সাথে সংলাপ করতে যে শিষ্টাচারসমূহ প্রবর্তন করেছে তাই এক্ষেত্রে নমুনা হিসেবে কাজ করে, আর এর ভিত্তি হলো আকল বা বিবেক এবং তাদেরকে যুক্তির মাধ্যমে পরিতুষ্ট করা, তবে তা অবশ্যই উত্তম পন্থায় হতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,


﴿ ۞وَلَا تُجَٰدِلُوٓاْ أَهۡلَ ٱلۡكِتَٰبِ إِلَّا بِٱلَّتِي هِيَ أَحۡسَنُ إِلَّا ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْ مِنۡهُمۡۖ وَقُولُوٓاْ ءَامَنَّا بِٱلَّذِيٓ أُنزِلَ إِلَيۡنَا وَأُنزِلَ إِلَيۡكُمۡ وَإِلَٰهُنَا وَإِلَٰهُكُمۡ وَٰحِدٞ وَنَحۡنُ لَهُۥ مُسۡلِمُونَ ٤٦ ﴾ [العنكبوت: ٤٦]


“আর তোমরা উত্তম পন্থা ছাড়া আহলে কিতাবদের সাথে বিতর্ক করো না। তবে তাদের মধ্যে ওরা ছাড়া, যারা যুলুম করেছে। আর তোমরা বল, ‘আমরা ঈমান এনেছি আমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে এবং তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তার প্রতি এবং আমাদের ইলাহ ও তোমাদের ইলাহ তো একই। আর আমরা তাঁরই সমীপে আত্মসমর্পণকারী’”। [সূরা আল্-আনকাবূত: ৪৬]


যদিও কাফির আত্মীয়ের সাথে মুসলমানের সম্পর্ক ছিন্ন করা ও তাদেরকে ভালবাসতে নিষেধ করা হয়েছে, তথাপি আল-কুরআন তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস করতে নির্দেশ দিয়েছে, যদিও তারা মুসলমানদের ধর্ম অস্বীকার করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,


﴿ وَإِن جَٰهَدَاكَ عَلَىٰٓ أَن تُشۡرِكَ بِي مَا لَيۡسَ لَكَ بِهِۦ عِلۡمٞ فَلَا تُطِعۡهُمَاۖ وَصَاحِبۡهُمَا فِي ٱلدُّنۡيَا مَعۡرُوفٗاۖ وَٱتَّبِعۡ سَبِيلَ مَنۡ أَنَابَ إِلَيَّۚ ثُمَّ إِلَيَّ مَرۡجِعُكُمۡ فَأُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمۡ تَعۡمَلُونَ ١٥ ﴾ [لقمان: ١٥]


“আর যদি তারা তোমাকে আমার সাথে শিরক করতে জোর চেষ্টা করে, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তখন তাদের আনুগত্য করবে না এবং দুনিয়ায় তাদের সাথে বসবাস করবে সদ্ভাবে। আর অনুসরণ কর তার পথ, যে আমার অভিমুখী হয়। তারপর আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তখন আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব, যা তোমরা করতে”। [সূরা লুকমান: ১৬]


এটা হলো ব্যক্তি পর্যায়ে, আর সমষ্টিগতভাবে ইসলাম তাদের সাথে সদ্ব্যবহার ও তাদের প্রতি ইহসান করতে নিষেধ করে নি। তবে শর্ত হলো তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না এবং মুসলিম শাসকের ছত্রছায়ায় থাকতে স্বীকৃতি জানাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,


﴿ لَّا يَنۡهَىٰكُمُ ٱللَّهُ عَنِ ٱلَّذِينَ لَمۡ يُقَٰتِلُوكُمۡ فِي ٱلدِّينِ وَلَمۡ يُخۡرِجُوكُم مِّن دِيَٰرِكُمۡ أَن تَبَرُّوهُمۡ وَتُقۡسِطُوٓاْ إِلَيۡهِمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلۡمُقۡسِطِينَ ٨ ﴾ [الممتحنة: ٨]


“দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের বাড়ি-ঘর থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করতে এবং তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করছেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায় পরায়ণদেরকে ভালবাসেন”। [সূরা আল-মুমতাহিনাহ: ৮]


যতদিন আহলে কিতাবরা ইসলামী শাসনের অধীনে ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে উত্তম আচরণ করেছেন, তাদেরকে ধর্মীয় ও মানবিক সব  ধরনের অধিকার দিয়েছেন। তাদের সাথে কৃত সব অঙ্গিকার ও চুক্তি পূর্ণ করেছেন। তাদের কল্যাণ কামনা করেছেন ও তাদেরকে ভাল উপদেশ দিয়েছেন। রাসূলের সাহাবী, তাবেঈ‘, তাবে তাবেঈ‘ ও অন্যান্য সব মুসলিম বিজয়ী  শাসকেরা বিজিত অঞ্চলের অমুসলিমদের সাথে ওয়াদা ও চুক্তি পূরণ এবং  তাদের সাথে নম্র ও উদার আচরণ করার ব্যাপারে খুবই সতর্ক ছিলেন। যে ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান রাখে সে জানে যে, যে সব মুসলমান তাদের সাথে বসবাস করেছে তারা কিভাবে তাদের অধিকার প্রদান করেছে।


ইমাম আবু ইউসুফ ইমাম মাকহুল আশ-শামী থেকে বর্ণনা করেন, আবু ‘উবাইদা ইবন আল-জাররা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু সিরিয়ার জিম্মিদের সাথে চুক্তি করেছিলেন যে, তারা যখন সেখানে প্রবেশ করবে তখন তাদের গির্জা ও বেচাকেনার জায়গা ছেড়ে দিবেন। তারা মুসলমানদের কাছে বছরে একটি দিন চাইলেন যে দিন তারা  ক্রুশ পড়ে বিনা চিহ্নে বের হবে, এটা তাদের ঈদের দিন। তিনি তাদের এ অনুরোধে সাড়া দেন এবং মুসলমানগণ তাদেরকৃত এ শর্ত পূরণ করেন।


অমুসলিমদের অন্যান্য অধিকার হলো:


তাদের সাথে কোনো চুক্তি করলে তা পূরণ করা। তাদের সঙ্গে কৃত অঙ্গিকার ও চুক্তি পূরণে কার্পণ্য না করা। আবু দাউদ রহ. তাঁর সনদে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,


قد روى أبو داود بسنده عن رسول الله  أنه قال: «أَلَا مَنْ ظَلَمَ مُعَاهَدًا أَوِ انْتَقَصَهُ أَوْ كَلَّفَهُ فَوْقَ طَاقَتِهِ، أَوْ أَخَذَ مِنْهُ شَيْئًا بِغَيْرِ طِيبِ نَفْسٍ مِنْهُ، فَأَنَا حَجِيجُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ»


“যে ব্যক্তি কোন (অমুসলিম) চুক্তিবদ্ধ কারো উপর যুলুম করবে বা চুক্তি ভঙ্গ করবে, বা তাঁর সাধ্যের বাইরে কিছু চাপিয়ে দিবে, বা তার সন্তুষ্টি ছাড়া বেশী নিবে কিয়ামতের দিন আমি তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবো”।


ইবন মাজাহ তে বর্ণিত আছে,


عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ قَتَلَ مُعَاهَدًا لَهُ ذِمَّةُ اللَّهِ وَذِمَّةُ رَسُولِهِ فَلَا يَرَحْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ، وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ سَبْعِينَ عَامًا»


“আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জিম্মায় থাকা কোন (অমুসলিম) চুক্তিবদ্ধ কাউকে হত্যা করবে সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। জান্নাতের ঘ্রাণ সত্তর বছরের রাস্তার দূরত্ব থেকে পাওয়া যায়”।


“বকর ইবন ওয়াইল গোত্রের এক লোক ‘উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর যুগে এক জিম্মিকে হিরা নামক স্থানে হত্যা করলে তিনি  তাকে নিহত ব্যক্তির অভিভাবকদের হাতে তুলে দিতে নির্দেশ দেন। তারা তাকে (হত্যাকারীকে) তাদের হাতে তুলে দিলে তারা (নিহতের অভিভাবকরা) তাকে হত্যা করে ফেলে”।


মুসলমানরা বিজয়ী এলাকায় অমুসলিমদের সাথে এ চমৎকার আচরণ করায় কিছু ন্যায়পরায়ণ খৃস্টান চিন্তাবিদরা এ বাস্তবতা অকপটে স্বীকার করেছেন। তারা মুসলমানদের এ চমৎকার উদার আচরণকে জোরালো ভাবে স্বীকার করেছেন।


ক্যান্ট হ্যানরী ক্যাস্টো “আল-ইসলাম খাওয়াতের ওয়া সাওয়ানেহ” বইয়ে বলেছেন, “আমি ইসলামী দেশের খৃস্টানদের ইতিহাস পড়েছি, এতে আমি এক চমৎকার বাস্তবতা দেখতে পেয়েছি, তা হলো: খৃস্টানদের সাথে মুসলমানরা কোমল আচরণ করতেন, তাদের সাথে কঠোরতা পরিহার করতেন, সদাচরণ ও  নম্র ব্যবহার করত”।


ইসলামের ন্যায়পরায়ণতা ও সব মানুষের সাথে ঐক্যের বিধান মতে মুসলমানরা অমুসলিমদের সাথে আচরণ করত। এ সুন্নতে মুহাম্মদী আজও বিদ্যমান আছে। এ আচরণ আল্লাহর পথে দাওয়াতের ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।  দ্বীনের পথের দা‘য়ীরা এ আচরণ ভুলে যাওয়া উচিত না। তাদের উচিত মুসলিম অমুসলিম সবার সাথে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ করা। তবে প্রকৃত বন্ধুত্বতো শুধু আল্লাহ, তাঁর দ্বীন, রাসূল ও মু’মিনদের সাথেই হবে।


যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না তাদের সাথে ইসলাম সদাচরণ করতে নির্দেশ দিয়েছে, আহলে কিতাবদের সাথে উদার আচরণ করতে আহ্বান করেছে, এ সবের পিছনে কারণ হলো তাদের মন জয় করা ও ইসলামের প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়ানো।


 


দ্বিতীয় সংশয়: ইসলামের শাস্তির বিধান সম্পর্কিত সংশয়।


তারা বলেন, ইসলামে শাস্তির বিধান খুবই নিষ্ঠুর, যা যুগের সাথে চলে না। নাগরিক জীবনে এগুলো চলে না। অতঃপর তারা বলেন, বিবাহিতের যিনার শাস্তি রজম তথা পাথর দ্বারা মৃত্যুদণ্ড কেন? এটা কি তাকে অপমান করা নয়? এ ধরনের শাস্তি মানুষের প্রাণনাশ বা অঙ্গ কর্তন হয়, এভাবে মানুষ শক্তি হারায় এবং শারীরিক বিকৃতি ঘটে। অতঃপর  তারা বলেন, ইসলামের শাস্তির বিধান বাস্তবায়ন মানে হলো পূর্বযুগে ফিরে যাওয়া, মক্কার পাহাড়ের মাঝে তৈরি এ সব আইন কানুন বিংশ শতাব্দীতে জ্ঞানবান মানুষের সাথে চলে না।


এ সব সংশয়সমূহ অপনোদনের পূর্বে তাদের এ ধরনের সংশয়ের কারণসমূহ আলোচনা করব।


প্রথম কারণ: ইসলামী শরী‘য়াহর শাস্তির বিধান সম্পর্কে অজ্ঞতা।


দ্বিতীয় কারণ: যে সব অপরাধের কারণে শাস্তি দেয়া হয় সেগুলোর ভয়াবহতা বিশ্লেষণে অগভীরভাবে দৃষ্টিপাত করে।


ফলে তারা এর হিকমত ও মূল্যায়ন সম্পর্কে ভাবে না।


তৃতীয় কারণ: তারা অপরাধ ও শাস্তির বিধানকে ইসলামের দৃষ্টিতে গবেষণা করে না।


হ্যাঁ ইসলামের শাস্তির বিধানে বাহ্যিক ভাবে কিছুটা নিষ্ঠুরতা ও কঠোরতা দেখা যায়। শাস্তিতে যদি কঠোরতা ও নিষ্ঠুরতা নাই থাকে তাহলে তিরস্কার ও  ভয় দেখানোর ফল কিভাবে আসবে। শাস্তি বাহ্যিক ভাবে কঠোর ও নিষ্ঠুর হলেও প্রকৃতপক্ষে তা রহমত ও দয়া। কেননা রোগাক্রান্তকে যদি ছেড়ে দেয়া হয় তবে তার রোগে সমাজের অন্যান্য ভালোরাও রোগী হয়ে যাবে। বরং অপরাধের ক্যান্সারে অন্যরাও আক্রান্ত হয়ে যাবে। তাই এটা অত্যাবশ্যকীয় ও হিকমতময় যে, সমাজের অন্যান্যদেরকে বাঁচাতে নষ্ট জিনিসকে চিরতরে নিঃশেষ করে দেয়া।


ইসলামের শাস্তির বিধানগুলোর প্রতি যারা চিন্তাভাবনা ছাড়া অগভীরভাবে তাকায় তাদের কাছে নির্দয় মনে হয়, কিন্তু এ সব শাস্তি ততক্ষণ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হয় না যতক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চিত করা না হয় যে, অপরাধী অপরাধটি করেছে এবং এতে কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই ।


ইসলাম হাত চুরির অপরাধে হাত কাটার বিধান দিয়েছে, কিন্তু যদি এটা সংশয় দেখা দেয় যে, সে ক্ষুধার কারণে চুরি করেছে তাহলে কখনো তার হাত কাটা হবে না। ইসলাম রজমের তথায় পাথর নিক্ষেপে হত্যার বিধান দিয়েছে, কিন্তু বিবাহিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে চারজন সাক্ষীর প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছাড়া কখনো তাকে রজম দেয়া হবে না। এটা প্রমাণ করে যে, শাস্তি শুধু হিসেব ছাড়া মানুষের উপর কর্তৃত্ব ও তাকে ভয় দেখানোর জন্যই দেয়া হয় না।


উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ছিলেন ইসলামের ফকিহদের মধ্যে অন্যতম, তিনি (রামাদাহর বছর) দুর্ভিক্ষের বছর চুরির শাস্তি প্রয়োগ করেন নি। এটা স্পষ্ট মূলভিত্তি, এখানে তা’বীল করার কোনো সুযোগ নেই। সমস্যা ও সন্দেহের কারণে শাস্তির বিধান রহিত হয়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্নোক্ত হাদীসে কারণে,


«ادرؤوا الحدود بالشبهات وأقيلوا عثرات الكرا إلا في حد من حدود الله».


“তোমরা সংশয়ের কারণে শাস্তির বিধান রহিত করো, আল্লাহর শাস্তি ব্যতিত সম্মানিত লোকের ছোট খাট ভুল থেকে অব্যাহতি দাও”।


তাদের দাবী হল, আল্লাহর শাস্তির বিধান প্রয়োগ করলে মানুষকে অবজ্ঞা ও হেয় প্রতিপন্ন করা হয়। আর যে সব দেশ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদী স্বাধীনতা ভোগ করে সে সব দেশের আধুনিক মতবাদের বিশ্বাসী ও রাজনীতিবিদরা মনে করেন মানুষকে শাস্তি দিয়ে নখ তুলে ফেলা, শরীর ঝলসানো, মাথায় ও শিরায় ইলেকটিক্যাল শক দেয়া, আগুনের দ্বারা সেক দেয়া, চুল উপড়ে ফেলা, তার সম্মানহানি করা ইত্যাদি মানুষকে অবজ্ঞা ও হেয় প্রতিপন্ন করা নয়! তারা আবার তাদের আইন কানুন ও সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে গর্ব করে?!


বিবাহিত মানুষকে রজমের মাধ্যমে হত্যা করার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এ মারাত্মক অপরাধের কঠোর ধমক ও তিরস্কার করা। রজমকৃতকে এভাবে হত্যা করার উদ্দেশ্য হলো তাকে কঠোর শাস্তি দেয়া আর অন্যান্যদেরকে এ ধরনের অপরাধ থেকে বিরত রাখা ও নিজের আত্মা ও শয়তান যাদেরকে এ ধরনের কাজে জড়িত হতে উৎসাহ দেয় তাদেরকে এ থেকে উপদেশ দেয়া যাতে তারা এ অপরাধে লিপ্ত না হয়।


এ সব কিছু ছাড়াও আমরা বলতে পারি, যিনি এ ধরনের শাস্তি নির্ধারণ করেছেন তিনি মানুষের অন্তরের সব খবর রাখেন, তিনি জানেন কিসে মানুষ এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকবে।


আল্লাহ তা ‘আলা বলেছেন,


﴿ وَٱللَّهُ يَعۡلَمُ ٱلۡمُفۡسِدَ مِنَ ٱلۡمُصۡلِحِۚ ٢٢٠ ﴾ [البقرة: ٢٢٠]


“আর আল্লাহ জানেন কে ফাসাদকারী, কে সংশোধনকারী” [সূরা আল-বাকারাহ: ২২০]


﴿ أَلَا يَعۡلَمُ مَنۡ خَلَقَ وَهُوَ ٱللَّطِيفُ ٱلۡخَبِيرُ ١٤ ﴾ [الملك: ١٤]


“যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না? অথচ তিনি অতি সুক্ষ্মদর্শী, পূর্ণ অবহিত”।  [সূরা : আল্-মুলক: ১৪]


তারা বলেন, শরী‘য়াহ এর শাস্তি কায়েম করা মানে মানুষের প্রাণনাশ ও অঙ্গহানি করা ইত্যাদি আরো নানা কথা।


আমরা তাদেরকে বলব: হত্যা ও অঙ্গহানি তো শুধু খারাপ লোকদের হয় যারা উৎপাদনশীল কোনো কাজ না করে  মারাত্মক অপরাধ করে, আর এতে হাজার হাজার মানুষের জীবন রক্ষা হয় ও লক্ষ লক্ষ উৎপাদনশীল ভাল ও পবিত্র অঙ্গ সংরক্ষণ হয়। এছাড়া যে সব দেশে আল্লাহর বিধান কৃত শাস্তির ব্যবস্থা চালু আছে সেখানে কুৎসিত ও অঙ্গহানি লোক তেমন দেখা যায় না। কেননা আল্লাহর শাস্তির বিধান মানুষ ও অপরাধের মাঝে এক বিশাল বাধা হয়ে দাঁড়ায়, ফলে মানুষ অপরাধে লিপ্ত হয় না। এতে অপরাধ কম সংঘটিত হয় এবং শাস্তির বিধান ও কম প্রয়োগ করা হয়। আল্লাহ তা‘আলা যথার্থই বলেছেন,


﴿ وَلَكُمۡ فِي ٱلۡقِصَاصِ حَيَوٰةٞ يَٰٓأُوْلِي ٱلۡأَلۡبَٰبِ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ١٧٩ ﴾ [البقرة: ١٧٩]


“আর হে বিবেকসম্পন্নগণ, কিসাসে রয়েছে তোমাদের জন্য জীবন, আশা করা যায় তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে”। [সূরা আল-বাকারাহ: ১৭৯]


 


 


উপসংহার


সব প্রশংসা মহান আল্লাহর যার নি‘য়ামতে ভালো কাজ সম্পন্ন হয়, সালাত ও সালাম শেষ নবীর উপর যার পরে আর কোনো নবী আসবেন না।


সব প্রশংসা আল্লাহর, তাঁর দয়া ও অনুগ্রহে এ কাজটি সম্পন্ন হলো। এ ছোট গবেষণাটি পূর্ণ হয়েছে। এতে আমি ইসলামী শরী‘য়াহর বাস্তবায়নের কিছু দিক তুলে ধরেছি, বিশেষ করে ইসলামী শরী‘য়াহর উৎস, বৈশিষ্ট্য, ইসলামী শরী‘য়াহ উদার ও সহজ সরল হওয়ার দলিল, ইসলামী শরী‘য়াহ বাস্তবায়নের হুকুম ও ইসলামী শরী‘য়াহর ব্যাপারে কতিপয় দ্বিধা সংশয় এবং এগুলোর অপনোদন।


গবেষণাটি যেহেতু শেষ পর্যায় তাই পরিশিষ্টে কিছু ফলাফল উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করি। এগুলো হলো:


১- ইসলামী শরী‘য়াহ পূর্ববর্তী সব শরী‘য়াহকে রহিতকারী।


২- এ শরী‘য়াহর উৎস হলেন এমন একজন, যিনি মানুষের কল্যাণ অকল্যাণ ও ভাল মন্দ সব কিছুই জানেন।


৩- রাজা প্রজা নির্বিশেষে সব মুসলমানের উচিত ইসলামী শরী‘য়াহ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করা।


৪- ইসলামী শরী‘য়াহকে বাদ দেয়াই হলো সব ধরনের অন্যায় ও ফিতনার কারণ।


৫- ইসলামী শরী‘য়াহ বাস্তবায়ন না করার ফলে রাজনৈতিক, সামাজিক, আখলাকি ও অর্থনৈতিক জীবনে অনেক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।


৬-  মুষ্টিমেয় কিছু নোংরা মানুষ ইসলামী শরী‘য়াহ বাস্তবায়ন করার ব্যাপারে নানা সন্দেহ সংশয় সৃষ্টি করছে, তাদের উদ্দেশ্য হলো মানব জীবনকে এ শরী‘য়াহ থেকে দূরে রাখা।


আমাদের সর্বশেষ দো‘আ হলো যে, সব প্রশংসা সৃষ্টিকুলের রব মহান আল্লাহ তা‘আলার, সালাত ও সালাম সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর।


 


 


সূত্রাবলী


১- আল-কুরআনুল কারীম।


২- আল-কামূস আল-মুহীত, লেখক আল্লামা মুহাম্মদ ই‘য়াকুব আল-ফাইরোয আবাদী, মুদ্রণ, মু’য়াসাসাতুর রিসালাহ, ১ম সংস্করণ।


৩- উসূলুশ শাশী, লেখক আস-সুরুখসী, ১ম খন্ড।


৪-  আল-হুকমু বিমা আনঝালাল্লাহ, লেখক আব্দুল আযিম ফাওদাহ, মুদ্রণ, দারুল বুহুস আল-‘ইলমিয়াহ লিন নাশরি ওয়াত তাওঝি, লেবানন, ১ম সংস্করণ।


৫- আল-ইকলীল ফি ইসতিম্বাতিত তানযীল, লেখক জাজালুদ্দীন আস- সুয়ূতী, মুদ্রণ: দারুল কুতুব আল-‘ইলমিয়াহ, লেবানন, ২য় সংস্করণ।


৬- আসবাবুল হুকম বিগাইরি মা আনঝালাল্লাহু, লেখক ডঃ সালেহ আস-সাদলান, মুদ্রণ: দারুল মুসলিম, ১ম সংস্করণ।


৭- আল-খিরাজ, লেখক ইমাম আবু ইউসুফ, মুদ্রণ: দারুল মা‘রিফাহ, লেবানন।


৮- তাহকিমুল কাওয়ানিন আল-ওয়াদ‘ঈয়াহ, লেখক, মুহাম্মদ ইবন ইবরাহীম আলে আশ-শাইখ, মুদ্রণ: দারুল ওয়াতান লিননাশরি ওয়াত্তাওঝি, ৭ম সংস্করণ।


৯- তালবিস ইবলিস, লেখক ইবনুল কাইয়্যুম,  মুদ্রণ: দারুল আরাবী, লেবানন।


১০- তাজুল লুগাহ ওয়া সিহাহুল আরাবীয়াহ, লেখক, আবু নসর ইসমাইল ইবন হাম্মাদ আল-জাওহারী, মুদ্রণ: দারুল ফিকর লিননাশরি ওয়াত্তাওঝি, ১ম সংস্করণ।


১১- তারিখুশ শারা’য়ে‘, লেখক ড: মুখতার কাদী, ১ম সংস্করণ।


১২-  তাফসীরুল কুরআনুল আযীম, লেখক হাফেয ইবন কাসীর, মুদ্রণ: কায়রো, ২য় সংস্করণ (১৩৭৫ হিজরী)।


১৩- জাহেলিয়াতুল কারনিল ‘ঈশরীন, লেখক মুহাম্মদ কুতুব, মুদ্রণ: দারুশ শুরুক, কায়রো, (১৪০২ হিজরী)।


১৪- সুনানে ইবন মাজাহ, মুদ্রণ: শারিকাতু তাবা‘আহ আল-আরাবীয়াহ আস-সউদীয়াহ, ৩য় সংস্করণ।


১৫- সুনানে আবু দাউদ, মুদ্রণ: দারুল মা‘আরিফাহ, লেবানন, ৩য় খন্ড।


১৬- শুবহাত হাওলাল ইসলাম, লেখক মুহাম্মদ কুতুব, মুদ্রণ: মাকতাবা ওয়াহাবাহ, কায়রো, ষষ্ঠ সংস্করণ (১৯৬৪ ইং)।


১৭- সহীহ বুখারী, লেখক ইমাম আল-বুখারী, ৯ম খন্ড।


১৮- আল-ফারুক উমর ইবন খাত্তাব, লেখক মুহাম্মদ রিদা,


মুদ্রণ: দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, লেবানন, ১ম খন্ড।


১৯- ফি মুওয়াজাহাতিল মু’আমারাতি ‘আলা তাত্ববীকিশ শরী‘য়াহ আল-ইসলামীয়াহ, লেখক, মুস্তফা ফারগিলী আশ-শুগাইরী, মুদ্রণ: মারকাজুল মালিক ফাইসাল লিলবুহুস ওয়াদদিরাসাতিল ইসলামিয়্যাহ, মুদ্রণ নং (১০৫১২, ১৮২৩)।


২০- মাসাদিরুত তাশরী’ ফিমা লা নসসা ফিহি, লেখক: আব্দুল ওয়াহহাব খাল্লাফ, ১ম সংস্করণ।


২১- আল-মুসতাসফা ফি ইলম আল-উসূল, লেখক: ইমাম গাযালী, ১ম সংস্করণ।


২২- মাসরা‘উশ শিরক ওয়াল খারাফাহ, লেখক খালিদ আলী আল-হাজ্ব, ১ম সংস্করণ।


২৩- মাজমু‘উ ফাতাওয়া শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়াহ, ইবন কাসিমের সন্নিবেশ, মুদ্রণ: আর-রিয়াসাহ আল-‘আম্মা লিলবুহুস, সৌদি আরব।


২৪- মুসনাদ ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল, মুদ্রণ: আল-মাকতাব আল-ইসলামী, লেবানন, ২য় সংস্করণ (১৪০৫ হিজরী)।


২৫- উজুব তাহকিমুশ শারী‘য়াহ আল ইসলামিয়া, লেখক, মান্না‘আ খলিল কাত্তান, মুদ্রণ: ইমাম মুহাম্মদ ইবন সউদ আল-ইসলামীয়াহ বিশ্ববিদ্যালয়, (১৪০৫ হিজরী)।


২৬- উজুব তাহকিমুশ শারী‘য়াহ আল ইসলামিয়া ফি কুল্লি ‘আসর, লেখক, সালিহ ইবন ঘানেম আস-সাদলান, মুদ্রণ: দারু বুলনাসিয়াহ লিননাশরি ওয়াততাওঝি, সৌদি আরব, ১ম সংস্করণ (১৪১৭ হিজরী)।


 


 


সূচীপত্র


 


ভূমিকা


প্রথম পরিচ্ছেদ: ইসলামী শরী‘য়াহর পরিচয়:


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: ইসলামী শরী‘য়াহর উৎসসমূহ:


প্রথম উৎস আল-কুরআনুল কারীম:


দ্বিতীয়ত: সুন্নাহ ও শরী‘য়াহ আইনে এর অবস্থান:


তৃতীয়ত: আল-ইজমা‘:


চতুর্থ: আল-ক্বিয়াস:


পঞ্চমত: আল-ইসতিহসান:


তৃতীয় পরিচ্ছেদ: ইসলামী শরী‘য়াহর বৈশিষ্ট্যসমূহ:


প্রথমত:


দ্বিতীয়ত:


তৃতীয়ত: ইসলামী শরী‘য়াহ বিশ্বব্যাপী ও সার্বজনীন:


চতুর্থত: ইসলামী শরী‘য়াহ এর বিধানসমূহ আক্বীদার সাথে সম্পৃক্ত:


পঞ্চমত: ইসলামী শরী‘য়াহ মানুষের অন্তরকে লালন পালন করে:


ষষ্ঠত: ইসলামী শরী‘য়াহ সমতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত:


চতুর্থ পরিচ্ছেদ: ইসলামী শরীয়াহ সহজ সরল হওয়ার দলিলসমূহ:


প্রথমত: আল-কুরআনুল কারীম থেকে দলিল:


দ্বিতীয়ত: সুন্নহ নববী থেকে ইসলামী শরী‘য়াহ সহজ সরল হওয়ার দলিল:


পঞ্চম পরিচ্ছেদ: ইসলামী শরী‘য়াহ বাস্তবায়নের হুকুম:


ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান ছাড়া অন্য বিধান অনুযায়ী শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করার কারণসমূহ ও এর ফলাফল:


প্রথমত:  আল্লাহর নাযিল কৃত বিধান ছাড়া অন্য বিধান অনুযায়ী শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করার কারণসমূহ:


প্রথম কারণ: ঈমান হীনতা বা ঈমানের দুর্বলতা:


দ্বিতীয় কারণ: কাফেরদের চাটুকারিতা ও তাদের উপর নির্ভরশীলতা:


তৃতীয় কারণ: ইসলামী শরী‘য়াহ সম্পর্কে অজ্ঞতা:


দ্বিতীয়ত: আল্লাহর শরী‘য়াহ বাস্তবায়ন না করার বিরূপ প্রতিক্রিয়াসমূহ:


প্রথম প্রতিক্রিয়া: আক্বিদার ক্ষেত্রে:


দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়া: ইবাদতের ক্ষেত্রে:


তৃতীয় প্রতিক্রিয়া: সামাজিক ক্ষেত্রে:


চতুর্থ প্রতিক্রিয়া: রাজনৈতিক ও বিচার ব্যবস্থায় এর প্রভাব:


পঞ্চম প্রতিক্রিয়া: অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে:


সপ্তম পরিচ্ছেদ: ইসলামী শরী‘য়াহর বিরুদ্ধে কতিপয় অপবাদ ও দ্বিধা সংশয় এবং এগুলোর অপনোদন:


প্রথম সংশয়:


দ্বিতীয় সংশয়: ইসলামের শাস্তির বিধান সম্পর্কিত সংশয়:


উপসংহার


সূত্রাবলী


সূচীপত্র


 


 


http://www.healthprose.org/ http://www.handlestresshelp.com/ https://www.hillsfarmacy.com/ http://www.ambienonlinebuycheap.com/

Article Read :
3951
Times
ইসলামী শরী‘য়াহর বাস্তবায়ন ও উম্মাহর উপর এর প্রভাব 454.0 KB
ইসলামী শরী‘য়াহর বাস্তবায়ন ও উম্মাহর উপর এর প্রভাব 330.5 KB
Live Now
close